জনতার প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ অবশেষে দেশে ফিরছে। দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় শনিবার (৩১ অক্টোবর) তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি সরকার।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। এর মধ্যে গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় নয়জনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়। বাকি মরদেহগুলোর পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। মরদেহগুলো দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতাও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি ৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে শনিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
দেশে ফিরতে যাওয়া পাঁচ প্রবাসী হলেন—নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।
এর আগে গত ৯ আগস্ট রিয়াদের ওই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা ছিলেন। দুর্ঘটনার পর প্রথম দফায় কয়েকজনের মরদেহ দেশে এলেও পরিচয় শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায় অন্যদের মরদেহ সৌদির হিমঘরে রাখা হয়েছিল।
প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় এতদিন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটিয়েছেন স্বজনেরা। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও তাঁরা পাননি কাঙ্ক্ষিত খবর। আত্রাইয়ের সত্তরোর্ধ্ব মজনু সরদার ও তাঁর স্ত্রী ছাইদা বেগমের অপেক্ষা ছিল সবচেয়ে বেদনাদায়ক। ছেলে মাসিদুল সরদারের মরদেহের খোঁজে তাঁরা প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। অশ্রুসিক্ত চোখে মজনু সরদারের একটাই আকুতি ছিল—মৃত্যুর আগে অন্তত একবার যেন ছেলের মুখটি দেখতে পারেন। অবশেষে মরদেহ দেশে ফেরার খবরে তাঁদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসন নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে মরদেহগুলো দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহ দেশে আসছে। তাঁদের মধ্যে চারজনের বাড়ি আত্রাই উপজেলায় এবং একজনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলায়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ইউএনও আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুরুতে আত্রাই উপজেলার ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে আত্রাইয়ের ১১ জন এবং নওগাঁ সদর উপজেলার একজনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে মরদেহ দেশে ফেরার খবরে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটলেও পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট কাটেনি। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ভিটেমাটি বন্ধক রেখে কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন এসব প্রবাসী। তাঁদের মৃত্যুতে পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি হারানোর পাশাপাশি দেশে রেখে গেছেন ঋণের বোঝা।
নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। পরিবারের একমাত্র সম্বল ভিটেবাড়িটিও মহাজনের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে এখন পাওনাদারদের তাগাদায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।
একদিকে প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে শোক আর আর্থিক সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নিহত প্রবাসীদের পরিবারগুলো।

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
জনতার প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ অবশেষে দেশে ফিরছে। দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় শনিবার (৩১ অক্টোবর) তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি সরকার।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। এর মধ্যে গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় নয়জনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়। বাকি মরদেহগুলোর পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। মরদেহগুলো দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতাও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি ৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে শনিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
দেশে ফিরতে যাওয়া পাঁচ প্রবাসী হলেন—নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।
এর আগে গত ৯ আগস্ট রিয়াদের ওই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা ছিলেন। দুর্ঘটনার পর প্রথম দফায় কয়েকজনের মরদেহ দেশে এলেও পরিচয় শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায় অন্যদের মরদেহ সৌদির হিমঘরে রাখা হয়েছিল।
প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় এতদিন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটিয়েছেন স্বজনেরা। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও তাঁরা পাননি কাঙ্ক্ষিত খবর। আত্রাইয়ের সত্তরোর্ধ্ব মজনু সরদার ও তাঁর স্ত্রী ছাইদা বেগমের অপেক্ষা ছিল সবচেয়ে বেদনাদায়ক। ছেলে মাসিদুল সরদারের মরদেহের খোঁজে তাঁরা প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে ছুটে যেতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। অশ্রুসিক্ত চোখে মজনু সরদারের একটাই আকুতি ছিল—মৃত্যুর আগে অন্তত একবার যেন ছেলের মুখটি দেখতে পারেন। অবশেষে মরদেহ দেশে ফেরার খবরে তাঁদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসন নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে মরদেহগুলো দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহ দেশে আসছে। তাঁদের মধ্যে চারজনের বাড়ি আত্রাই উপজেলায় এবং একজনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলায়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ইউএনও আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুরুতে আত্রাই উপজেলার ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে আত্রাইয়ের ১১ জন এবং নওগাঁ সদর উপজেলার একজনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে মরদেহ দেশে ফেরার খবরে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটলেও পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট কাটেনি। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ভিটেমাটি বন্ধক রেখে কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন এসব প্রবাসী। তাঁদের মৃত্যুতে পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি হারানোর পাশাপাশি দেশে রেখে গেছেন ঋণের বোঝা।
নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। পরিবারের একমাত্র সম্বল ভিটেবাড়িটিও মহাজনের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে এখন পাওনাদারদের তাগাদায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।
একদিকে প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে শোক আর আর্থিক সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নিহত প্রবাসীদের পরিবারগুলো।

আপনার মতামত লিখুন