জনতার প্রেস ফিচার ডেস্ক
ক্যামেরার সামনে একজন মানুষ কথা বলছেন। সামনে টেলিপ্রম্পটার, পাশে প্রযোজকের নির্দেশনা, কানে ইয়ারফোন। কিন্তু পর্দার ওপাশে থাকা দর্শকের কাছে এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উপস্থাপক কী বলছেন, কতটা জানেন এবং তাঁর কথায় কতটা আস্থা রাখা যায়। তাঁর উপস্থাপনায় এমন কী আছে, যা দর্শককে পরের মুহূর্তেও পর্দার সামনে ধরে রাখবে?
উপস্থাপনা কেবল সুন্দর করে কথা বলার নাম নয়; এটি তথ্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার শিল্প, একই সঙ্গে বিশ্বাস তৈরির প্রক্রিয়া। একজন দক্ষ উপস্থাপক শুধু লেখা পড়েন না, বরং একটি সংবাদ, অনুষ্ঠান, সাক্ষাৎকার কিংবা গল্পকে দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তোলেন।
‘দ্য আর্ট অব কমিউনিকেশন ইজ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব লিডারশিপ’—যোগাযোগের শিল্পই নেতৃত্বের ভাষা। উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও এ কথার যথেষ্ট প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কারণ, একজন উপস্থাপকের কণ্ঠ, শব্দচয়ন, প্রস্তুতি, উপস্থাপনভঙ্গি ও দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরির ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তাঁর পরিবেশনার কার্যকারিতা।
প্রথম আলো বন্ধুসভা ও অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির (এবিসি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনলাইন কর্মশালা ‘প্রেজেন্টেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এর চতুর্থ সেশনে উঠে এসেছে উপস্থাপনার এমন নানা দিক। গত ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এ সেশনে ‘সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনা’ বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ দেন ক্রীড়া উপস্থাপক ফাহিম রহমান, যমুনা টিভির জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক মৌসুমী আহমেদ লোপা এবং উপস্থাপক ও অভিনয়শিল্পী মৌসুমী মৌ।
তাঁদের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে কয়েকটি বিষয়—প্রস্তুতি, নিয়মিত অনুশীলন, জানার আগ্রহ, তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতা এবং নিজস্ব উপস্থাপনভঙ্গি গড়ে তোলা।
একটি সংবাদ দর্শকের কাছে পৌঁছানোর আগে এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন অনেক মানুষ। মাঠে প্রতিবেদক তথ্য সংগ্রহ করেন, নিউজরুমে সেগুলো যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়, এরপর সংবাদটি পৌঁছায় উপস্থাপকের হাতে। এই প্রক্রিয়াকে রেস্তোরাঁর সঙ্গে তুলনা করেন ফাহিম রহমান।
রান্নাঘরে খাবার তৈরি হওয়াই শেষ কথা নয়; সেটি কীভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে গ্রাহকের প্রথম অনুভূতি। উপস্থাপকের কাজও অনেকটা এমন। সংবাদ তৈরি করা তাঁর প্রধান দায়িত্ব নয়, বরং প্রস্তুত সংবাদকে দর্শকের সামনে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে তাঁরা বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং আগ্রহ নিয়ে শুনতে থাকেন।
এ ক্ষেত্রে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের প্রথম কয়েক মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপস্থাপকের কণ্ঠ, শব্দচয়ন, চোখের দৃষ্টি, কথা বলার গতি ও স্বাভাবিকতা—সবকিছু মিলে তৈরি হয় প্রথম ধারণা।
তবে সুন্দরভাবে পরিবেশন করাই যথেষ্ট নয়। যে বিষয়টি উপস্থাপন করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে উপস্থাপকের নিজেরও পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
ফাহিম রহমানের বক্তব্যের মূল কথা হলো, কোনো বিষয় না জেনে কেবল স্ক্রিপ্ট পড়ে গেলেই তা অর্থবহ উপস্থাপনা হয়ে ওঠে না। সংবাদটি কী নিয়ে, এর প্রেক্ষাপট কী এবং এর গুরুত্ব কোথায়—এসব সম্পর্কে ধারণা না থাকলে উপস্থাপনা কৃত্রিম হয়ে পড়তে পারে।
এটি শুধু সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নয়; ব্যবসায়িক প্রেজেন্টেশন, সাক্ষাৎকার কিংবা যেকোনো ধরনের উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। টেলিপ্রম্পটারে লেখা থাকলেই একজন উপস্থাপক পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যান না। তাঁকে নিয়মিত সংবাদ অনুসরণ করতে হবে, চারপাশের ঘটনা সম্পর্কে জানতে হবে এবং সাম্প্রতিক তথ্যের সঙ্গে পরিচিত থাকতে হবে।
একজন উপস্থাপকের দক্ষতার অন্যতম বড় পরীক্ষা সাক্ষাৎকার নেওয়া। বিশেষ করে অতিথি যদি পরিচিত বা প্রভাবশালী কেউ হন, তবে প্রথম দিকে নার্ভাস লাগা স্বাভাবিক।
কী প্রশ্ন করবেন, কীভাবে শুরু করবেন কিংবা একটি প্রশ্নের পর পরবর্তী প্রশ্ন কী হবে—এসব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি সেই অস্বস্তি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
সাক্ষাৎকারের জন্য শুধু প্রশ্ন তৈরি করলেই হয় না; প্রশ্নটি কীভাবে করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই প্রশ্ন দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হলে তার প্রভাব বদলে যেতে পারে।
এখানেই উপস্থাপকের দক্ষতা—নিজের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে দর্শকের কৌতূহলকে তুলে ধরা। দর্শকের মনে যেন হয়, তাঁর নিজের প্রশ্নটিই অতিথিকে করা হচ্ছে। এ দক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না; এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান এবং মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস।
উপস্থাপনা শেখার জন্য শুরুতেই অত্যাধুনিক স্টুডিও, দামি ক্যামেরা কিংবা পেশাদার সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। একজন নবীন উপস্থাপকের প্রথম স্টুডিও হতে পারে নিজের ঘর, আর প্রথম দর্শক হতে পারেন আয়নায় দেখা নিজের প্রতিবিম্ব।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সংবাদ পড়া, কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা কিংবা প্রশ্ন করার অনুশীলন দীর্ঘদিন ধরেই উপস্থাপনা শেখার পরিচিত পদ্ধতি। ফাহিম রহমান নিজেও প্রশিক্ষণের সময় আয়নার সামনে সংবাদ পড়ে অনুশীলন করেছেন।
এই অনুশীলনের বড় সুবিধা হলো, নিজের ভুল নিজেই শনাক্ত করা যায়। চোখ কোথায় যাচ্ছে, মুখের অভিব্যক্তি কেমন, কোথায় অপ্রয়োজনীয় বিরতি হচ্ছে কিংবা কথা বলার গতি বেশি কি না—এসব সহজেই খেয়াল করা সম্ভব।
একইভাবে জড়তা, ভয়, চোখের দৃষ্টির সমস্যা কিংবা অতিথির দিকে তাকিয়ে কথা বলার অস্বস্তিও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে কমানো যায়।
অর্থাৎ, উপস্থাপনায় আত্মবিশ্বাস কেবল সহজাত প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না; নিয়মিত প্রস্তুতি ও অনুশীলনও এতে বড় ভূমিকা রাখে।
লাইভ সংবাদ উপস্থাপনায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্ক্রিপ্টে টাইপিংয়ের ভুল থাকলে উপস্থাপকও বিভ্রান্ত হতে পারেন। তবে একটি ভুল যেন পুরো উপস্থাপনাকে ব্যাহত না করে, সেটি সামলে নেওয়াই দক্ষতার পরিচয়।
মৌসুমী আহমেদ লোপার মতে, সংবাদ সম্পর্কে উপস্থাপকের ন্যূনতম ধারণা থাকলে স্ক্রিপ্টে ভুল থাকলেও তা অনেক সময় শনাক্ত করা সম্ভব। আর ভুল পড়ে ফেললেও আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। কারণ, উপস্থাপকও মানুষ; তাঁরও ভুল হতে পারে।
কোনো শব্দ ভুল উচ্চারণ করলে বা ভুল পড়ে ফেললে প্রয়োজনে সংক্ষিপ্তভাবে সংশোধন করে পরের অংশে এগিয়ে যাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভুলের কারণে যেন কণ্ঠস্বর, মুখভঙ্গি কিংবা আচরণে অতিরিক্ত অস্বস্তি প্রকাশ না পায়।
দর্শক অনেক সময় ভুলটির চেয়ে সেটি সামলানোর ধরন বেশি লক্ষ করেন। বিষয় সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলে উপস্থাপক স্ক্রিপ্টের বাইরেও পরিস্থিতি সামলে নিতে পারেন। এ কারণেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জ্ঞানের সম্পর্ক গভীর।
সংবাদ উপস্থাপনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো, টেলিপ্রম্পটার দেখে পড়লেও যেন দর্শকের মনে না হয়, উপস্থাপক কেবল একটি লেখা পড়ে যাচ্ছেন।
মৌসুমী আহমেদ লোপার পরামর্শ, দর্শকের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে হবে, যেন বসার ঘরে পরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। টেলিপ্রম্পটার থাকবে, কিন্তু এর উপস্থিতি যেন উপস্থাপনার স্বাভাবিকতাকে আড়াল না করে।
এ ক্ষেত্রে উচ্চারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট ও শ্রুতিগ্রাহ্য হতে হবে। কোনো শব্দ বুঝতে দর্শককে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে হলে উপস্থাপনার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে পারে।
একটি সংবাদ বুলেটিনের পেছনে প্রতিবেদক, সম্পাদক, প্রযোজকসহ অনেকের শ্রম থাকে। মাঠে প্রতিবেদক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তথ্য সংগ্রহ করেন, নিউজরুমে তা যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল দর্শকের সামনে তুলে ধরেন উপস্থাপক। ফলে তাঁর দায়িত্বও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে দর্শকের সামনে বিনোদন ও তথ্যের অসংখ্য বিকল্প রয়েছে। একটি চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে যেতে তাঁদের মাত্র কয়েক সেকেন্ড লাগে। এমন পরিস্থিতিতে একঘেয়ে ও যান্ত্রিক উপস্থাপনা দিয়ে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন।
উপস্থাপনায় আগ্রহী অনেক তরুণীর মনে একটি প্রশ্ন থাকে—হিজাব পরে কি সংবাদ উপস্থাপনা করা যায়?
মৌসুমী আহমেদ লোপার মতে, বিষয়টি মূলত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে হিজাব পরেও নারীরা সংবাদ উপস্থাপনা করছেন। অর্থাৎ, যেখানে প্রতিষ্ঠান অনুমতি দেয়, সেখানে হিজাব উপস্থাপনার পথে বাধা নয়।
একজন উপস্থাপকের পেশাগত পরিচয় গড়ে ওঠে তাঁর জ্ঞান, কণ্ঠ, উপস্থাপনভঙ্গি, পেশাদারত্ব এবং দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতার ভিত্তিতে। নির্দিষ্ট কোনো পোশাক নয়, বরং কাজের দক্ষতা ও প্রস্তুতিই তাঁর সক্ষমতার মূল পরিচায়ক।
মৌসুমী মৌ উপস্থাপনাকে দেখেন দীর্ঘমেয়াদি শেখার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে। তাঁর মতে, এ পেশায় দ্রুত সাফল্যের চেয়ে ধৈর্য, অধ্যবসায় ও নিয়মিত শেখার মানসিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে কী ঘটছে, বিশ্বে কী ঘটছে, কোন ব্যক্তি কী করছেন—এসব জানার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত সাক্ষাৎকার নেন, তাঁদের প্রস্তুতি শুধু সাক্ষাৎকারের আগের কয়েক ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না।
মৌসুমী মৌ নিজের প্রস্তুতির জন্য অতিথিদের নিয়ে আলাদা নোট রাখেন। তাঁর কাছে এমন ২০ থেকে ২৫টি ডায়েরি রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তির জীবনের গল্প, আগের সাক্ষাৎকার এবং নতুন তথ্য নোট করা আছে। নতুন কোনো তথ্য জানলে সেটিও সেখানে যুক্ত করেন। তাঁর কাছে এ অভ্যাস শুধু পেশাগত প্রস্তুতি নয়, শেখার আনন্দেরও অংশ।
কারও প্রস্তুতির মাধ্যম ডায়েরি, কারও ফোনের নোটবুক। মাধ্যম আলাদা হলেও উদ্দেশ্য এক—নিজের জানার পরিধি বাড়ানো এবং প্রয়োজনের সময় তথ্য কাজে লাগানোর মতো করে সংরক্ষণ করা।
এভাবেই প্রতিদিনের শেখার অভ্যাস একসময় একজন উপস্থাপকের পেশাগত প্রস্তুতির শক্ত ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মৌসুমী মৌয়ের আলোচনায় উঠে আসে উপস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্যক্তি হিসেবে একজন মানুষ যে রকম, ক্যামেরার সামনে বা মঞ্চে উপস্থাপক হিসেবে তাঁর আচরণ সব সময় হুবহু একই রকম নাও হতে পারে।
মঞ্চে, ক্যামেরার সামনে কিংবা উপস্থাপকের আসনে তাঁকে পরিস্থিতি অনুযায়ী কণ্ঠস্বর, কথা বলার গতি ও অভিব্যক্তি বদলাতে হয়। একজন রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎকারের ভাষা ও স্বরভঙ্গি যেমন হতে পারে, একজন সংগীতশিল্পীর সঙ্গে কথোপকথনে তা একই রকম নাও হতে পারে।
অর্থাৎ, ভালো উপস্থাপক শুধু সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী নন; তিনি পরিস্থিতি বুঝতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী নিজের উপস্থাপনভঙ্গি মানিয়ে নিতে পারেন।
কখন ধীরে বলতে হবে, কখন গতি বাড়াতে হবে, কোথায় কণ্ঠস্বর নিচু করতে হবে কিংবা কখন প্রাণবন্ত হতে হবে—এই বোধ তৈরি হয় নিয়মিত কাজ, পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে।
উপস্থাপনা শেখার শুরুতে অন্যের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া কিংবা কোনো অভিজ্ঞ উপস্থাপকের ভঙ্গি অনুসরণ করা স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘ মেয়াদে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
দর্শক শেষ পর্যন্ত সেই উপস্থাপককেই মনে রাখেন, যাঁর কথা বলার ধরন, উপস্থাপনভঙ্গি ও যোগাযোগের কৌশলে নিজস্বতা রয়েছে। অন্যের ভঙ্গি অনুকরণ করে সাময়িকভাবে শেখা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত পরিচয়ের বিকল্প হতে পারে না।
নিজস্বতা গড়ে তুলতে প্রয়োজন বিস্তৃত জ্ঞান, নিয়মিত পড়াশোনা এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহ। সংবাদপত্র, বই, অনুষ্ঠান, সাক্ষাৎকার—সবকিছু থেকেই শেখার সুযোগ রয়েছে।
মৌসুমী মৌয়ের মতে, জ্ঞানের কোনো শেষ নেই। তাই উপস্থাপকের শেখার প্রক্রিয়াও কখনো থেমে থাকা উচিত নয়। কাজের প্রতি ভালোবাসা ও ধৈর্য এ দীর্ঘ যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কাজ করতে গিয়ে একঘেয়েমি আসতে পারে, প্রস্তুতির সময় কম পাওয়া যেতে পারে কিংবা লাইভ অনুষ্ঠানে ভুল হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত শেখার মানসিকতা থাকলে এসব অভিজ্ঞতাকেও দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব।
একজন উপস্থাপকের কাজকে তিনটি উদ্দেশ্যে সংক্ষেপ করেন মৌসুমী মৌ—‘টু ইনফর্ম, টু এডুকেট, টু এন্টারটেইন’। অর্থাৎ, দর্শককে তথ্য দেওয়া, কিছু শেখানো এবং একই সঙ্গে তাঁর আগ্রহ ধরে রাখা।
এই তিনটি উদ্দেশ্য একসঙ্গে পূরণ করতে পারলে উপস্থাপনা কেবল কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে কার্যকর যোগাযোগ।
এ যোগাযোগের সাফল্য শুধু ক্যামেরার সামনে নির্ধারিত হয় না, এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় দর্শকের প্রতিক্রিয়ায়। দর্শক তথ্যটি শুনলেন কি না, বুঝলেন কি না, মনে রাখলেন কি না এবং আবার সেই উপস্থাপকের পরিবেশনা দেখতে আগ্রহী হলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই ফুটে ওঠে উপস্থাপনার কার্যকারিতা।
শেষ পর্যন্ত একজন উপস্থাপক সংবাদ বা অনুষ্ঠানকে শুধু দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন না; তিনি দর্শক ও বিষয়বস্তুর মধ্যে একটি সেতু তৈরি করেন। সেই সেতু যত স্বাভাবিক, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রাণবন্ত হয়, যোগাযোগও তত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তাই উপস্থাপনার প্রথম পাঠ শুধু কণ্ঠস্বর ঠিক করা নয়। প্রথমে বিষয়টি জানতে হবে, এরপর নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে এবং সবশেষে নিজের মতো করে তা দর্শকের সামনে তুলে ধরতে হবে।
কারণ, ক্যামেরার সামনে সুন্দর কণ্ঠে কথা বলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপক হয়ে উঠতে হলে প্রয়োজন জ্ঞান, প্রস্তুতি, অনুশীলন, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং দর্শকের সঙ্গে সত্যিকারের যোগাযোগ তৈরির দক্ষতা।

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
জনতার প্রেস ফিচার ডেস্ক
ক্যামেরার সামনে একজন মানুষ কথা বলছেন। সামনে টেলিপ্রম্পটার, পাশে প্রযোজকের নির্দেশনা, কানে ইয়ারফোন। কিন্তু পর্দার ওপাশে থাকা দর্শকের কাছে এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উপস্থাপক কী বলছেন, কতটা জানেন এবং তাঁর কথায় কতটা আস্থা রাখা যায়। তাঁর উপস্থাপনায় এমন কী আছে, যা দর্শককে পরের মুহূর্তেও পর্দার সামনে ধরে রাখবে?
উপস্থাপনা কেবল সুন্দর করে কথা বলার নাম নয়; এটি তথ্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার শিল্প, একই সঙ্গে বিশ্বাস তৈরির প্রক্রিয়া। একজন দক্ষ উপস্থাপক শুধু লেখা পড়েন না, বরং একটি সংবাদ, অনুষ্ঠান, সাক্ষাৎকার কিংবা গল্পকে দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তোলেন।
‘দ্য আর্ট অব কমিউনিকেশন ইজ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব লিডারশিপ’—যোগাযোগের শিল্পই নেতৃত্বের ভাষা। উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও এ কথার যথেষ্ট প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কারণ, একজন উপস্থাপকের কণ্ঠ, শব্দচয়ন, প্রস্তুতি, উপস্থাপনভঙ্গি ও দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরির ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তাঁর পরিবেশনার কার্যকারিতা।
প্রথম আলো বন্ধুসভা ও অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির (এবিসি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনলাইন কর্মশালা ‘প্রেজেন্টেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এর চতুর্থ সেশনে উঠে এসেছে উপস্থাপনার এমন নানা দিক। গত ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এ সেশনে ‘সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনা’ বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ দেন ক্রীড়া উপস্থাপক ফাহিম রহমান, যমুনা টিভির জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক মৌসুমী আহমেদ লোপা এবং উপস্থাপক ও অভিনয়শিল্পী মৌসুমী মৌ।
তাঁদের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে কয়েকটি বিষয়—প্রস্তুতি, নিয়মিত অনুশীলন, জানার আগ্রহ, তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতা এবং নিজস্ব উপস্থাপনভঙ্গি গড়ে তোলা।
একটি সংবাদ দর্শকের কাছে পৌঁছানোর আগে এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন অনেক মানুষ। মাঠে প্রতিবেদক তথ্য সংগ্রহ করেন, নিউজরুমে সেগুলো যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়, এরপর সংবাদটি পৌঁছায় উপস্থাপকের হাতে। এই প্রক্রিয়াকে রেস্তোরাঁর সঙ্গে তুলনা করেন ফাহিম রহমান।
রান্নাঘরে খাবার তৈরি হওয়াই শেষ কথা নয়; সেটি কীভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে গ্রাহকের প্রথম অনুভূতি। উপস্থাপকের কাজও অনেকটা এমন। সংবাদ তৈরি করা তাঁর প্রধান দায়িত্ব নয়, বরং প্রস্তুত সংবাদকে দর্শকের সামনে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে তাঁরা বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং আগ্রহ নিয়ে শুনতে থাকেন।
এ ক্ষেত্রে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের প্রথম কয়েক মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপস্থাপকের কণ্ঠ, শব্দচয়ন, চোখের দৃষ্টি, কথা বলার গতি ও স্বাভাবিকতা—সবকিছু মিলে তৈরি হয় প্রথম ধারণা।
তবে সুন্দরভাবে পরিবেশন করাই যথেষ্ট নয়। যে বিষয়টি উপস্থাপন করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে উপস্থাপকের নিজেরও পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
ফাহিম রহমানের বক্তব্যের মূল কথা হলো, কোনো বিষয় না জেনে কেবল স্ক্রিপ্ট পড়ে গেলেই তা অর্থবহ উপস্থাপনা হয়ে ওঠে না। সংবাদটি কী নিয়ে, এর প্রেক্ষাপট কী এবং এর গুরুত্ব কোথায়—এসব সম্পর্কে ধারণা না থাকলে উপস্থাপনা কৃত্রিম হয়ে পড়তে পারে।
এটি শুধু সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নয়; ব্যবসায়িক প্রেজেন্টেশন, সাক্ষাৎকার কিংবা যেকোনো ধরনের উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। টেলিপ্রম্পটারে লেখা থাকলেই একজন উপস্থাপক পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যান না। তাঁকে নিয়মিত সংবাদ অনুসরণ করতে হবে, চারপাশের ঘটনা সম্পর্কে জানতে হবে এবং সাম্প্রতিক তথ্যের সঙ্গে পরিচিত থাকতে হবে।
একজন উপস্থাপকের দক্ষতার অন্যতম বড় পরীক্ষা সাক্ষাৎকার নেওয়া। বিশেষ করে অতিথি যদি পরিচিত বা প্রভাবশালী কেউ হন, তবে প্রথম দিকে নার্ভাস লাগা স্বাভাবিক।
কী প্রশ্ন করবেন, কীভাবে শুরু করবেন কিংবা একটি প্রশ্নের পর পরবর্তী প্রশ্ন কী হবে—এসব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি সেই অস্বস্তি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
সাক্ষাৎকারের জন্য শুধু প্রশ্ন তৈরি করলেই হয় না; প্রশ্নটি কীভাবে করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই প্রশ্ন দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হলে তার প্রভাব বদলে যেতে পারে।
এখানেই উপস্থাপকের দক্ষতা—নিজের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে দর্শকের কৌতূহলকে তুলে ধরা। দর্শকের মনে যেন হয়, তাঁর নিজের প্রশ্নটিই অতিথিকে করা হচ্ছে। এ দক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না; এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান এবং মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস।
উপস্থাপনা শেখার জন্য শুরুতেই অত্যাধুনিক স্টুডিও, দামি ক্যামেরা কিংবা পেশাদার সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। একজন নবীন উপস্থাপকের প্রথম স্টুডিও হতে পারে নিজের ঘর, আর প্রথম দর্শক হতে পারেন আয়নায় দেখা নিজের প্রতিবিম্ব।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সংবাদ পড়া, কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা কিংবা প্রশ্ন করার অনুশীলন দীর্ঘদিন ধরেই উপস্থাপনা শেখার পরিচিত পদ্ধতি। ফাহিম রহমান নিজেও প্রশিক্ষণের সময় আয়নার সামনে সংবাদ পড়ে অনুশীলন করেছেন।
এই অনুশীলনের বড় সুবিধা হলো, নিজের ভুল নিজেই শনাক্ত করা যায়। চোখ কোথায় যাচ্ছে, মুখের অভিব্যক্তি কেমন, কোথায় অপ্রয়োজনীয় বিরতি হচ্ছে কিংবা কথা বলার গতি বেশি কি না—এসব সহজেই খেয়াল করা সম্ভব।
একইভাবে জড়তা, ভয়, চোখের দৃষ্টির সমস্যা কিংবা অতিথির দিকে তাকিয়ে কথা বলার অস্বস্তিও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে কমানো যায়।
অর্থাৎ, উপস্থাপনায় আত্মবিশ্বাস কেবল সহজাত প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না; নিয়মিত প্রস্তুতি ও অনুশীলনও এতে বড় ভূমিকা রাখে।
লাইভ সংবাদ উপস্থাপনায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্ক্রিপ্টে টাইপিংয়ের ভুল থাকলে উপস্থাপকও বিভ্রান্ত হতে পারেন। তবে একটি ভুল যেন পুরো উপস্থাপনাকে ব্যাহত না করে, সেটি সামলে নেওয়াই দক্ষতার পরিচয়।
মৌসুমী আহমেদ লোপার মতে, সংবাদ সম্পর্কে উপস্থাপকের ন্যূনতম ধারণা থাকলে স্ক্রিপ্টে ভুল থাকলেও তা অনেক সময় শনাক্ত করা সম্ভব। আর ভুল পড়ে ফেললেও আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। কারণ, উপস্থাপকও মানুষ; তাঁরও ভুল হতে পারে।
কোনো শব্দ ভুল উচ্চারণ করলে বা ভুল পড়ে ফেললে প্রয়োজনে সংক্ষিপ্তভাবে সংশোধন করে পরের অংশে এগিয়ে যাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভুলের কারণে যেন কণ্ঠস্বর, মুখভঙ্গি কিংবা আচরণে অতিরিক্ত অস্বস্তি প্রকাশ না পায়।
দর্শক অনেক সময় ভুলটির চেয়ে সেটি সামলানোর ধরন বেশি লক্ষ করেন। বিষয় সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলে উপস্থাপক স্ক্রিপ্টের বাইরেও পরিস্থিতি সামলে নিতে পারেন। এ কারণেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জ্ঞানের সম্পর্ক গভীর।
সংবাদ উপস্থাপনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো, টেলিপ্রম্পটার দেখে পড়লেও যেন দর্শকের মনে না হয়, উপস্থাপক কেবল একটি লেখা পড়ে যাচ্ছেন।
মৌসুমী আহমেদ লোপার পরামর্শ, দর্শকের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে হবে, যেন বসার ঘরে পরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। টেলিপ্রম্পটার থাকবে, কিন্তু এর উপস্থিতি যেন উপস্থাপনার স্বাভাবিকতাকে আড়াল না করে।
এ ক্ষেত্রে উচ্চারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট ও শ্রুতিগ্রাহ্য হতে হবে। কোনো শব্দ বুঝতে দর্শককে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে হলে উপস্থাপনার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে পারে।
একটি সংবাদ বুলেটিনের পেছনে প্রতিবেদক, সম্পাদক, প্রযোজকসহ অনেকের শ্রম থাকে। মাঠে প্রতিবেদক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তথ্য সংগ্রহ করেন, নিউজরুমে তা যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল দর্শকের সামনে তুলে ধরেন উপস্থাপক। ফলে তাঁর দায়িত্বও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে দর্শকের সামনে বিনোদন ও তথ্যের অসংখ্য বিকল্প রয়েছে। একটি চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে যেতে তাঁদের মাত্র কয়েক সেকেন্ড লাগে। এমন পরিস্থিতিতে একঘেয়ে ও যান্ত্রিক উপস্থাপনা দিয়ে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন।
উপস্থাপনায় আগ্রহী অনেক তরুণীর মনে একটি প্রশ্ন থাকে—হিজাব পরে কি সংবাদ উপস্থাপনা করা যায়?
মৌসুমী আহমেদ লোপার মতে, বিষয়টি মূলত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে হিজাব পরেও নারীরা সংবাদ উপস্থাপনা করছেন। অর্থাৎ, যেখানে প্রতিষ্ঠান অনুমতি দেয়, সেখানে হিজাব উপস্থাপনার পথে বাধা নয়।
একজন উপস্থাপকের পেশাগত পরিচয় গড়ে ওঠে তাঁর জ্ঞান, কণ্ঠ, উপস্থাপনভঙ্গি, পেশাদারত্ব এবং দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতার ভিত্তিতে। নির্দিষ্ট কোনো পোশাক নয়, বরং কাজের দক্ষতা ও প্রস্তুতিই তাঁর সক্ষমতার মূল পরিচায়ক।
মৌসুমী মৌ উপস্থাপনাকে দেখেন দীর্ঘমেয়াদি শেখার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে। তাঁর মতে, এ পেশায় দ্রুত সাফল্যের চেয়ে ধৈর্য, অধ্যবসায় ও নিয়মিত শেখার মানসিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে কী ঘটছে, বিশ্বে কী ঘটছে, কোন ব্যক্তি কী করছেন—এসব জানার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত সাক্ষাৎকার নেন, তাঁদের প্রস্তুতি শুধু সাক্ষাৎকারের আগের কয়েক ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না।
মৌসুমী মৌ নিজের প্রস্তুতির জন্য অতিথিদের নিয়ে আলাদা নোট রাখেন। তাঁর কাছে এমন ২০ থেকে ২৫টি ডায়েরি রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তির জীবনের গল্প, আগের সাক্ষাৎকার এবং নতুন তথ্য নোট করা আছে। নতুন কোনো তথ্য জানলে সেটিও সেখানে যুক্ত করেন। তাঁর কাছে এ অভ্যাস শুধু পেশাগত প্রস্তুতি নয়, শেখার আনন্দেরও অংশ।
কারও প্রস্তুতির মাধ্যম ডায়েরি, কারও ফোনের নোটবুক। মাধ্যম আলাদা হলেও উদ্দেশ্য এক—নিজের জানার পরিধি বাড়ানো এবং প্রয়োজনের সময় তথ্য কাজে লাগানোর মতো করে সংরক্ষণ করা।
এভাবেই প্রতিদিনের শেখার অভ্যাস একসময় একজন উপস্থাপকের পেশাগত প্রস্তুতির শক্ত ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মৌসুমী মৌয়ের আলোচনায় উঠে আসে উপস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্যক্তি হিসেবে একজন মানুষ যে রকম, ক্যামেরার সামনে বা মঞ্চে উপস্থাপক হিসেবে তাঁর আচরণ সব সময় হুবহু একই রকম নাও হতে পারে।
মঞ্চে, ক্যামেরার সামনে কিংবা উপস্থাপকের আসনে তাঁকে পরিস্থিতি অনুযায়ী কণ্ঠস্বর, কথা বলার গতি ও অভিব্যক্তি বদলাতে হয়। একজন রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎকারের ভাষা ও স্বরভঙ্গি যেমন হতে পারে, একজন সংগীতশিল্পীর সঙ্গে কথোপকথনে তা একই রকম নাও হতে পারে।
অর্থাৎ, ভালো উপস্থাপক শুধু সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী নন; তিনি পরিস্থিতি বুঝতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী নিজের উপস্থাপনভঙ্গি মানিয়ে নিতে পারেন।
কখন ধীরে বলতে হবে, কখন গতি বাড়াতে হবে, কোথায় কণ্ঠস্বর নিচু করতে হবে কিংবা কখন প্রাণবন্ত হতে হবে—এই বোধ তৈরি হয় নিয়মিত কাজ, পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে।
উপস্থাপনা শেখার শুরুতে অন্যের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া কিংবা কোনো অভিজ্ঞ উপস্থাপকের ভঙ্গি অনুসরণ করা স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘ মেয়াদে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
দর্শক শেষ পর্যন্ত সেই উপস্থাপককেই মনে রাখেন, যাঁর কথা বলার ধরন, উপস্থাপনভঙ্গি ও যোগাযোগের কৌশলে নিজস্বতা রয়েছে। অন্যের ভঙ্গি অনুকরণ করে সাময়িকভাবে শেখা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত পরিচয়ের বিকল্প হতে পারে না।
নিজস্বতা গড়ে তুলতে প্রয়োজন বিস্তৃত জ্ঞান, নিয়মিত পড়াশোনা এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহ। সংবাদপত্র, বই, অনুষ্ঠান, সাক্ষাৎকার—সবকিছু থেকেই শেখার সুযোগ রয়েছে।
মৌসুমী মৌয়ের মতে, জ্ঞানের কোনো শেষ নেই। তাই উপস্থাপকের শেখার প্রক্রিয়াও কখনো থেমে থাকা উচিত নয়। কাজের প্রতি ভালোবাসা ও ধৈর্য এ দীর্ঘ যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কাজ করতে গিয়ে একঘেয়েমি আসতে পারে, প্রস্তুতির সময় কম পাওয়া যেতে পারে কিংবা লাইভ অনুষ্ঠানে ভুল হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত শেখার মানসিকতা থাকলে এসব অভিজ্ঞতাকেও দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব।
একজন উপস্থাপকের কাজকে তিনটি উদ্দেশ্যে সংক্ষেপ করেন মৌসুমী মৌ—‘টু ইনফর্ম, টু এডুকেট, টু এন্টারটেইন’। অর্থাৎ, দর্শককে তথ্য দেওয়া, কিছু শেখানো এবং একই সঙ্গে তাঁর আগ্রহ ধরে রাখা।
এই তিনটি উদ্দেশ্য একসঙ্গে পূরণ করতে পারলে উপস্থাপনা কেবল কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে কার্যকর যোগাযোগ।
এ যোগাযোগের সাফল্য শুধু ক্যামেরার সামনে নির্ধারিত হয় না, এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় দর্শকের প্রতিক্রিয়ায়। দর্শক তথ্যটি শুনলেন কি না, বুঝলেন কি না, মনে রাখলেন কি না এবং আবার সেই উপস্থাপকের পরিবেশনা দেখতে আগ্রহী হলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই ফুটে ওঠে উপস্থাপনার কার্যকারিতা।
শেষ পর্যন্ত একজন উপস্থাপক সংবাদ বা অনুষ্ঠানকে শুধু দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন না; তিনি দর্শক ও বিষয়বস্তুর মধ্যে একটি সেতু তৈরি করেন। সেই সেতু যত স্বাভাবিক, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রাণবন্ত হয়, যোগাযোগও তত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তাই উপস্থাপনার প্রথম পাঠ শুধু কণ্ঠস্বর ঠিক করা নয়। প্রথমে বিষয়টি জানতে হবে, এরপর নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে এবং সবশেষে নিজের মতো করে তা দর্শকের সামনে তুলে ধরতে হবে।
কারণ, ক্যামেরার সামনে সুন্দর কণ্ঠে কথা বলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপক হয়ে উঠতে হলে প্রয়োজন জ্ঞান, প্রস্তুতি, অনুশীলন, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং দর্শকের সঙ্গে সত্যিকারের যোগাযোগ তৈরির দক্ষতা।

আপনার মতামত লিখুন