জনতার প্রেস ডেস্ক:
স্বৈরাচারকে পরাস্ত করা গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়; নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব তৈরি সম্ভব।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আয়োজনে ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ও বৃত্তি’ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিভাগের সাত শিক্ষার্থীকে দুটি ক্যাটেগরিতে পুরস্কার ও বৃত্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে সেরা স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার পেয়েছেন অর্থী নবনীতা ও ফারাহ জাহান শুচি। আর স্নাতকোত্তর গবেষণা প্রস্তাব বৃত্তি পেয়েছেন ফারাহ জাহান শুচি, উসামা রাফিদ, আজরা হুমায়রা, কৌরিত্র পোদ্দার তীর্থ, মোহাম্মদ আল মুকিত ও মুহাম্মদ মুযযাম্মিল হক। ফারাহ জাহান শুচি দুই ক্যাটেগরিতেই পুরস্কৃত হয়েছেন।
আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ মাসের মধ্যে প্রায় নয় মাস তিনি প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেছেন। এত বড় গণঅভ্যুত্থান এবং পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাখ্যানের পরও আমলাতন্ত্রের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ইচ্ছা তিনি দেখতে পাননি।
সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, বাস্তবতাকে আড়াল না করে স্পষ্টভাবে বলতে হবে—আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী।
আলী রীয়াজের মতে, আমলাদের একটি অংশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভুদের সেবা করতে বেশি আগ্রহী।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, এর মূল কারণ ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের ইতিহাস নয়; বরং ১৯৯১ সালের পর থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ।
তাঁর ভাষ্য, পরবর্তী সরকারগুলোর সময় এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল এবং ২০০৯ সালের পর রাষ্ট্রযন্ত্র সরাসরি একটি দলের যন্ত্রে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব রয়েছে। এই কাঠামোর পরিবর্তন না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কঠিন।
গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন আলী রীয়াজ।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের স্বার্থে ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এই চক্র থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পারবে কি না, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রকৃত অর্থে সংস্কারের পথে যেতে কতটা ইচ্ছুক, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে আলী রীয়াজ বলেন, ওই গণঅভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি। বরং এটি ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের প্রত্যাখ্যানের বহিঃপ্রকাশ।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো সেই জায়গা আবার দখল করলেও গণঅভ্যুত্থানের সময় জনগণের দেওয়া বার্তাটি বোঝা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
জনতার প্রেস ডেস্ক:
স্বৈরাচারকে পরাস্ত করা গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়; নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব তৈরি সম্ভব।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আয়োজনে ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ও বৃত্তি’ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিভাগের সাত শিক্ষার্থীকে দুটি ক্যাটেগরিতে পুরস্কার ও বৃত্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে সেরা স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার পেয়েছেন অর্থী নবনীতা ও ফারাহ জাহান শুচি। আর স্নাতকোত্তর গবেষণা প্রস্তাব বৃত্তি পেয়েছেন ফারাহ জাহান শুচি, উসামা রাফিদ, আজরা হুমায়রা, কৌরিত্র পোদ্দার তীর্থ, মোহাম্মদ আল মুকিত ও মুহাম্মদ মুযযাম্মিল হক। ফারাহ জাহান শুচি দুই ক্যাটেগরিতেই পুরস্কৃত হয়েছেন।
আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ মাসের মধ্যে প্রায় নয় মাস তিনি প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেছেন। এত বড় গণঅভ্যুত্থান এবং পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাখ্যানের পরও আমলাতন্ত্রের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ইচ্ছা তিনি দেখতে পাননি।
সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, বাস্তবতাকে আড়াল না করে স্পষ্টভাবে বলতে হবে—আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী।
আলী রীয়াজের মতে, আমলাদের একটি অংশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভুদের সেবা করতে বেশি আগ্রহী।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, এর মূল কারণ ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের ইতিহাস নয়; বরং ১৯৯১ সালের পর থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ।
তাঁর ভাষ্য, পরবর্তী সরকারগুলোর সময় এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল এবং ২০০৯ সালের পর রাষ্ট্রযন্ত্র সরাসরি একটি দলের যন্ত্রে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব রয়েছে। এই কাঠামোর পরিবর্তন না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কঠিন।
গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন আলী রীয়াজ।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের স্বার্থে ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এই চক্র থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পারবে কি না, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রকৃত অর্থে সংস্কারের পথে যেতে কতটা ইচ্ছুক, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে আলী রীয়াজ বলেন, ওই গণঅভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি। বরং এটি ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের প্রত্যাখ্যানের বহিঃপ্রকাশ।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো সেই জায়গা আবার দখল করলেও গণঅভ্যুত্থানের সময় জনগণের দেওয়া বার্তাটি বোঝা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।

আপনার মতামত লিখুন