এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইতিহাসের নানা সময়ে জন্মেছেন সফল অনেক নারী। তবে তাঁদের মধ্যে এমন কয়েকজন আছেন, যাঁরা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করেই থেমে যাননি; বরং উগ্রপন্থী শক্তির মুখোমুখি হয়ে নারী অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন, শিক্ষার বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছেন, কিংবা মানব পাচারের শিকার হাজার হাজার নারীকে ফিরিয়ে এনেছেন আলোর পথে। আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের এমন ছয় অদম্য নারীর জীবনসংগ্রাম ও সমাজ পরিবর্তনের গল্প নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূত বেগম রোকেয়া (১৮৮০–১৯৩২)। রংপুর জেলার পায়রাবন্দে জন্মগ্রহণকারী রোকেয়া তৎকালীন সামাজিক বাধার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি। কিন্তু ভাইদের সহায়তায় গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখেন। ১৯০৫ সালে তিনি লেখেন বিশ্বখ্যাত নারীবাদী কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (Sultana's Dream)। ১৯০৯ সালে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে বিহারের ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে হাজারো নারী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯১৬ সালে গঠিত তাঁর ‘আনজুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর ‘রোকেয়া দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
কন্যাসন্তান হওয়ায় জন্মের পরপরই যাকে রোদে ফেলে রাখা হয়েছিল, সেই ফাওজিয়া কুফিই পরবর্তী সময়ে আফগান রাজনীতির শক্তিশালী মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি আফগানিস্তানের ইতিহাসের প্রথম নারী ডেপুটি স্পিকার। তালেবান আমলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হলে তিনি জাতিসংঘের হয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন করেন এবং ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০২০ সালে আততায়ীদের গুলি থেকে বেঁচে ফিরেই তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন। ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় এলে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং বর্তমানে নির্বাসনে থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আফগান নারীদের হয়ে লড়ছেন।
মাত্র ২১ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায় মুনিবা মাজারির। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি আর কখনো হাঁটতে পারবেন না। কিন্তু হুইলচেয়ারকে সঙ্গী করেই গড়ে তোলেন নতুন জীবন। পাকিস্তানের প্রথম হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মডেল ও টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার (UN Women) পাকিস্তান অঞ্চলের প্রথম জাতীয় শুভেচ্ছাদূত নির্বাচিত হন। স্থান পান বিবিসির ‘১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী নারী’ এবং ফোর্বসের ‘৩০ আন্ডার ৩০’ তালিকায়।
ভারতের মণিপুরের এক সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে এসে বক্সিংয়ে ইতিহাস গড়েছেন মেরি কম। পরিবারের অমতে খেলা শুরু করে তিনি ৬ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন—যা কোনো নারী বক্সারের ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ড। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ভারতের প্রথম নারী বক্সার হিসেবে পদক জয়ের পাশাপাশি এশিয়ান ও কমনওয়েলথ গেমসেও সোনা যেতেন তিনি। দুই সন্তানের জন্মদানের পরও রিঙে ফিরে আবার বিশ্বসেরা হন মেরি কম। ২০২০ সালে তাঁকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মবিভূষণ’-এ ভূষিত করা হয়। বর্তমানে তাঁর একাডেমিতে সুবিধাবঞ্চিত তরুণ-তরুণীরা বিনামূল্যে বক্সিং শেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
শ্রীলঙ্কার সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ড. আশা দে ভোস ভারত মহাসাগরের নীল তিমি নিয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। গবেষণায় তিনি প্রমাণ করেন, উত্তর ভারত মহাসাগরের নীল তিমিগুলো পরিযায়ী নয়, বরং তারা সারাবছর স্থানীয় পরিবেশেই বসবাস করে। অক্সফোর্ড এবং সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওপর পিএইচডি অর্জনকারী শ্রীলঙ্কার প্রথম নারী তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সামুদ্রিক সংরক্ষণ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ওশানস-ওয়েল’ আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। বিবিসির '১০০ নারী' তালিকায়ও স্থান পেয়েছেন এই বিজ্ঞানী।
পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া নেপালের অনুরাধা কৈরালা ১৯৯৩ সালে গড়ে তোলেন ‘মাইতি নেপাল’ নামের একটি মানবিক সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটি ভারত-নেপাল সীমান্তে নজরদারি চালুর পাশাপাশি মানব পাচারের শিকার নারী ও শিশুদের উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত ২৩ হাজারেরও বেশি নারী ও শিশুকে উদ্ধার করেছে সংস্থাটি। অসামান্য এই মানবিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে তিনি ‘সিএনএন হিরো অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন এবং ২০১৭ সালে পান ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’।
দক্ষিণ এশিয়ার এই ছয় মহীয়সী নারী প্রমাণ করেছেন, বাধা যত বড়ই হোক না কেন, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সমাজ ও ইতিহাসকে বদলে দেওয়া সম্ভব।
(তথ্যসূত্র: বিবিসি ও ডয়েচে ভেলে)

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইতিহাসের নানা সময়ে জন্মেছেন সফল অনেক নারী। তবে তাঁদের মধ্যে এমন কয়েকজন আছেন, যাঁরা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করেই থেমে যাননি; বরং উগ্রপন্থী শক্তির মুখোমুখি হয়ে নারী অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন, শিক্ষার বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছেন, কিংবা মানব পাচারের শিকার হাজার হাজার নারীকে ফিরিয়ে এনেছেন আলোর পথে। আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের এমন ছয় অদম্য নারীর জীবনসংগ্রাম ও সমাজ পরিবর্তনের গল্প নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূত বেগম রোকেয়া (১৮৮০–১৯৩২)। রংপুর জেলার পায়রাবন্দে জন্মগ্রহণকারী রোকেয়া তৎকালীন সামাজিক বাধার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি। কিন্তু ভাইদের সহায়তায় গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখেন। ১৯০৫ সালে তিনি লেখেন বিশ্বখ্যাত নারীবাদী কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (Sultana's Dream)। ১৯০৯ সালে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে বিহারের ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে হাজারো নারী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯১৬ সালে গঠিত তাঁর ‘আনজুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর ‘রোকেয়া দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
কন্যাসন্তান হওয়ায় জন্মের পরপরই যাকে রোদে ফেলে রাখা হয়েছিল, সেই ফাওজিয়া কুফিই পরবর্তী সময়ে আফগান রাজনীতির শক্তিশালী মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি আফগানিস্তানের ইতিহাসের প্রথম নারী ডেপুটি স্পিকার। তালেবান আমলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হলে তিনি জাতিসংঘের হয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন করেন এবং ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০২০ সালে আততায়ীদের গুলি থেকে বেঁচে ফিরেই তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন। ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় এলে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং বর্তমানে নির্বাসনে থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আফগান নারীদের হয়ে লড়ছেন।
মাত্র ২১ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায় মুনিবা মাজারির। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি আর কখনো হাঁটতে পারবেন না। কিন্তু হুইলচেয়ারকে সঙ্গী করেই গড়ে তোলেন নতুন জীবন। পাকিস্তানের প্রথম হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মডেল ও টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার (UN Women) পাকিস্তান অঞ্চলের প্রথম জাতীয় শুভেচ্ছাদূত নির্বাচিত হন। স্থান পান বিবিসির ‘১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী নারী’ এবং ফোর্বসের ‘৩০ আন্ডার ৩০’ তালিকায়।
ভারতের মণিপুরের এক সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে এসে বক্সিংয়ে ইতিহাস গড়েছেন মেরি কম। পরিবারের অমতে খেলা শুরু করে তিনি ৬ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন—যা কোনো নারী বক্সারের ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ড। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ভারতের প্রথম নারী বক্সার হিসেবে পদক জয়ের পাশাপাশি এশিয়ান ও কমনওয়েলথ গেমসেও সোনা যেতেন তিনি। দুই সন্তানের জন্মদানের পরও রিঙে ফিরে আবার বিশ্বসেরা হন মেরি কম। ২০২০ সালে তাঁকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মবিভূষণ’-এ ভূষিত করা হয়। বর্তমানে তাঁর একাডেমিতে সুবিধাবঞ্চিত তরুণ-তরুণীরা বিনামূল্যে বক্সিং শেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
শ্রীলঙ্কার সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ড. আশা দে ভোস ভারত মহাসাগরের নীল তিমি নিয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। গবেষণায় তিনি প্রমাণ করেন, উত্তর ভারত মহাসাগরের নীল তিমিগুলো পরিযায়ী নয়, বরং তারা সারাবছর স্থানীয় পরিবেশেই বসবাস করে। অক্সফোর্ড এবং সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওপর পিএইচডি অর্জনকারী শ্রীলঙ্কার প্রথম নারী তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সামুদ্রিক সংরক্ষণ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ওশানস-ওয়েল’ আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। বিবিসির '১০০ নারী' তালিকায়ও স্থান পেয়েছেন এই বিজ্ঞানী।
পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া নেপালের অনুরাধা কৈরালা ১৯৯৩ সালে গড়ে তোলেন ‘মাইতি নেপাল’ নামের একটি মানবিক সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটি ভারত-নেপাল সীমান্তে নজরদারি চালুর পাশাপাশি মানব পাচারের শিকার নারী ও শিশুদের উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত ২৩ হাজারেরও বেশি নারী ও শিশুকে উদ্ধার করেছে সংস্থাটি। অসামান্য এই মানবিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে তিনি ‘সিএনএন হিরো অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন এবং ২০১৭ সালে পান ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’।
দক্ষিণ এশিয়ার এই ছয় মহীয়সী নারী প্রমাণ করেছেন, বাধা যত বড়ই হোক না কেন, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সমাজ ও ইতিহাসকে বদলে দেওয়া সম্ভব।
(তথ্যসূত্র: বিবিসি ও ডয়েচে ভেলে)

আপনার মতামত লিখুন