জনতার প্রেস

হার্ট অ্যাটাক হলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। কখনো বুকে তীব্র চাপ বা ব্যথা অনুভূত হয়, আবার কখনো গ্যাস কিংবা অ্যাসিডিটির সমস্যা বলেও মনে হতে পারে। অনেকেই উপসর্গ কমে যাওয়ার আশায় অপেক্ষা করেন। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে এমন বিলম্ব বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে হৃদপেশি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখতে হবে, অযথা নড়াচড়া করতে দেওয়া যাবে না এবং নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়া যাবে না। চিকিৎসক বা জরুরি সেবাকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী অ্যাসপিরিন নেওয়া যেতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে প্রথম পাঁচ মিনিটে কী করবেন, জেনে নিন। প্রথম মিনিট: সব কাজ বন্ধ করুন বুকে ব্যথা, চাপ বা হার্ট অ্যাটাকের অন্য কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চলমান কাজ থামিয়ে দিন। হাঁটাহাঁটি, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা কিংবা শারীরিক পরিশ্রম থেকে বিরত থাকুন। দ্রুত জরুরি সহায়তা চান। নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। অ্যাম্বুলেন্সের কর্মীরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে পারেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মিনিট: শান্ত হয়ে বিশ্রাম নিন আতঙ্কিত না হয়ে যতটা সম্ভব স্থির থাকুন। পিঠে ভর দিয়ে আরামদায়কভাবে বসুন এবং আঁটসাঁট পোশাক ঢিলে করে দিন। একা বাড়িতে থাকলে দরজার তালা খুলে রাখুন, যাতে উদ্ধারকারীরা সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। কাছের কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকুন। লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, সেটিও মনে রাখার চেষ্টা করুন। হাসপাতালে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চতুর্থ ও পঞ্চম মিনিট: অ্যাসপিরিনের বিষয়ে সতর্ক থাকুন হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে জরুরি সেবাকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়া যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি থাকলে, রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা থাকলে কিংবা চিকিৎসক আগে থেকেই ওষুধটি নিষেধ করে থাকলে তা খাওয়া যাবে না। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস ও ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় ৩০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ACC/AHA নির্দেশিকায় অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোমের ক্ষেত্রে ১৬২ থেকে ৩২৫ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার সুপারিশ রয়েছে। তবে অ্যাসপিরিন কখনোই জরুরি চিকিৎসার বিকল্প নয়। মনে রাখতে হবে, অ্যাসপিরিনের মাত্রা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। ১৬ বছরের কম বয়সী কাউকে অ্যাসপিরিন দেওয়া উচিত নয়। অন্যের জন্য নির্ধারিত ওষুধ নিজে ব্যবহার করা কিংবা অ্যান্টাসিড, ব্যথানাশক ও ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করাও ঠিক নয়। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কী কী? হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী ভাব, আঁটসাঁট অনুভূতি কিংবা চেপে ধরার মতো ব্যথা। এ ছাড়া দেখা দিতে পারে— সব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কি একই রকম? না। অনেকের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের সময় বুকে ব্যথা নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অসুস্থ বোধ করা কিংবা চোয়াল, পিঠ ও পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গকে অনেকে গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। তাই লক্ষণ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে ২০২১ সালে ‘জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক রিসার্চ’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করা যায়। দিল্লির একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪৭ জন STEMI রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বুকে ব্যথা শুরু হওয়ার পর হাসপাতালে পৌঁছাতে রোগীদের গড়ে ৪ দশমিক ৭ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। মাত্র ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছান। আর অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে এসেছিলেন মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ রোগী। আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হয়ে গেলে কী করবেন? হার্ট অ্যাটাকের পর কেউ অচেতন হয়ে পড়লে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে সেটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণ হতে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত জরুরি সহায়তা ডাকতে হবে এবং সিপিআর শুরু করতে হবে। বুকের ঠিক মাঝখানে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার জোরে ও দ্রুত চাপ দিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁপানোর মতো শ্বাস নিলেও সেটিকে স্বাভাবিক শ্বাস হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। আশপাশে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (AED) থাকলে কাউকে সেটি নিয়ে আসতে বলুন এবং যন্ত্রটির নির্দেশনা অনুসরণ করুন। জরুরি সহায়তা না পৌঁছানো পর্যন্ত সিপিআর চালিয়ে যেতে হবে। হার্ট অ্যাটাকের সময় যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন ব্যথা নিজে থেকেই কমে যাবে—এমন আশায় অপেক্ষা করা যাবে না। নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়া, ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা কিংবা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করাও বিপজ্জনক। গরম পানীয়, মালিশ, গ্যাসের ওষুধ বা তথাকথিত ‘কাফ সিপিআর’-এর মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা করার চেষ্টা করবেন না। অন্যের জন্য নির্ধারিত ওষুধও ব্যবহার করা যাবে না। দ্রুত চিকিৎসা কেন জরুরি? হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী কোনো ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে আক্রান্ত অংশের হৃদপেশি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। চিকিৎসা পেতে যত দেরি হয়, হৃদপেশির ক্ষতির আশঙ্কাও তত বাড়ে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সাধারণত দ্রুত ইসিজি (ECG) ও প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করা হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধের ওষুধ দেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনি খুলে স্টেন্ট বসানো হয়। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জীবন বাঁচাতে পারে এবং হৃদপেশির স্থায়ী ক্ষতি, হার্ট ফেইলিওর ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।

হার্ট অ্যাটাক হলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন