সেই বিমানে শিশুসন্তানসহ আমরা ছিলাম
আমাদের ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে প্রথমবার সমুদ্রভ্রমণে গিয়েছিলাম। দুই দিনের ভ্রমণ শেষে কক্সবাজার থেকে বিমানে ঢাকায় ফিরছিলাম।
প্লেনে ওঠার আগে ফোনের স্ক্রিনে দেখি, আমার মা বেশ কয়েকবার কল দিয়েছেন। একটু তাড়া থাকায় তখন কল ব্যাক করার সময় হয়ে ওঠেনি। তা ছাড়া ভেবেছিলাম, অল্প সময়ের ব্যাপার, ঢাকায় ল্যান্ড করে কল দেব।
বিমানে ওঠার পর প্রথম ৩০ মিনিট ভালোভাবেই কেটে গেল। হঠাৎ খেয়াল করলাম, বিমানটি ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানসহ অন্য শিশুরাও চিৎকার করে কাঁদছে। তাদের কান্না ছিল অস্বাভাবিক। তারা বমি করারও চেষ্টা করছিল। এর মধ্যে একজন এয়ারহোস্টেস এসে সামনের এক যাত্রীর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, জরুরি মুহূর্তে তিনি এক্সিট করতে পারবেন কি না!
আমার স্বামী শুভ কথাটি শুনতে পেয়েছিল। যদিও আমি তখনো কিছু বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম, আকাশে মেঘের কারণে ল্যান্ড করতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু বারবার যখন বলা হচ্ছিল, সিটবেল্ট না খুলতে, প্লেনে ঝাঁকুনি হলে ভয় না পেতে, তখন কিছুটা অস্বাভাবিক লাগছিল।
এর কিছুক্ষণ পর ঘোষণা করা হলো, বিমানে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ল্যান্ডিং গিয়ারে সমস্যা হওয়ায় একটি চাকা নামানো যাচ্ছে না। আমরা হয়তো রানওয়েতেই ল্যান্ড করব। জরুরি বার্তা দেওয়া হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে এক্সিট করি।
মুহূর্তেই সব থমকে গেল। যাত্রীরা সবাই চুপ। আমি শুভর দিকে তাকিয়ে বললাম, আমরা ফিরব তো? ও শক্ত করে আমার হাতটা ধরে বলল, ইনশাআল্লাহ।
আমার কোলে আমাদের ১৯ মাসের ছোট্ট সন্তান, পাশে আমার স্বামী। আমরা একটা পুরো পরিবার। এমন বেশ কিছু পরিবার এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়েছে। তখন আমরা স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে অনেক ওপরে। বিমান একটু নিচে নামছে, আবার ওপরে উঠে যাচ্ছে।
বারবার এয়ারহোস্টেস এসে বলে যাচ্ছেন, তাঁরা নির্দেশনা দেওয়া মাত্রই যেন আমরা এক্সিট করি।
আমাদের সিট বিমানের পাখার কাছাকাছি। সেখান থেকে কীভাবে এক্সিট করব, তা জানতে চাইলে একজন এয়ারহোস্টেস বললেন, যেন দ্রুত বেরিয়ে আসি, ব্যাগ বা অন্য কোনো কিছুর জন্য সময় নষ্ট না করি। বেঁচে থাকলে ব্যাগ পাওয়া যাবে, কিন্তু আগে জীবন। তাঁর চোখেমুখেও ভয়ের ছাপ। এমনকি এয়ারহোস্টেসের মুখে হাসি থাকলেও চোখে পানি ছলছল করছিল।
জানালা দিয়ে আবারও তাকিয়ে দেখলাম, আমরা স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়েও অনেক ওপরে। আমার বাচ্চাটাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে, শুভর হাত ধরে আমরা দুজন দুজনকে শেষ বিদায় জানালাম।
সময়টা এত কঠিন ছিল যে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পারছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, পরিবারের আর কারও সঙ্গে হয়তো কথা হবে না। ইশ, তখন যদি মায়ের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারতাম, অন্তত শেষবারের মতো কথা বলা হতো!
আমার ছোট বোনের ফোনে একটি বার্তা পাঠিয়ে রাখলাম, যেন আমরা আর ফিরে না এলেও শেষ বার্তাটি তাদের কাছে পৌঁছায়।
একবার ইউএস-বাংলার ঢাকা থেকে নেপালগামী একটি ফ্লাইট দুর্ঘটনায় পড়েছিল। সেই দুর্ঘটনায় রাজশাহীর একজন নারী শিক্ষক মারা যান। এরপর থেকে আমারও মনে হতো, যেদিন বিমানে উঠব, সেদিনই হয়তো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে। অবশ্য প্রথমবার প্লেনে ওঠার পর সেই ভয় কেটে গিয়েছিল।
বারবার মনে হতে লাগল, আমাদের মতো একটা ছোট্ট পরিবারও তো সেদিন সেই দুর্ঘটনায় ছিল। তাদের কোলেও আমার সন্তানের মতো ছোট্ট শিশু ছিল। বারবার সেই শিশুর কথা মনে হতে আমরা আমাদের সন্তান ইফরাহকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরছিলাম। আমাদের ইফরাহ এই পৃথিবীর কিছুই বোঝে না। এখনো কত কিছু দেখা তার বাকি! আমার ছোট্ট শিশুটাকে নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়ব, কল্পনাও করতে পারিনি।
এই পৃথিবীতে হয়তো আর কিছুক্ষণ আছি, এরপর সব শেষ।
আমি জানালার পাশে বসেছিলাম। তাই ইফরাহকে শুভর কোলে দিয়ে বললাম, তুমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, ওকে নিয়ে যেন আগে বের হতে পারো।
বুঝতে পারছিলাম, ক্র্যাশ করলে আর কোনো আশাই নেই। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখছিলাম আমরা।
কিছুক্ষণ পর আবার ঘোষণা দেওয়া হলো, আমরা এখন স্বাভাবিকভাবে ল্যান্ড করার চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ, আমরা সুস্থভাবে নামতে পারব। জানি না, কী হতে চলেছে! মাটির কাছাকাছি ফিরতেই দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অস্থিরতা শুরু হলো। সিটবেল্ট খোলার জন্য হাত প্রস্তুত রেখেছিলাম, যেন ল্যান্ড করতেই সঙ্গে সঙ্গে নেমে যেতে পারি।
এরপর মিরাকলের মতো কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই পাইলট ল্যান্ড করতে সক্ষম হলেন। বিমানে থাকা সব যাত্রী হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। প্রায় দুই ঘণ্টার ভয়ানক ট্রমার মধ্যে চাপা কান্না আটকে রেখে আমরা সবাই কীভাবে বসেছিলাম, তা এখনো ভাবলে অবাক লাগে। নিজেও জানি না, এই ট্রমা থেকে কবে বের হতে পারব।
এখনো আমার মনে হচ্ছে, আমি বিমানের মধ্যে আছি, আর বিমানটি ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, চক্রাকারে অনবরত ঘুরেই চলেছে। আর ফিরব না ভেবে প্রিয় মানুষের কাছে শেষ বিদায় জানানোর মুহূর্ত আর বাচ্চার অস্বাভাবিক কান্না মস্তিষ্কে আটকে আছে।
হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হব। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়, কিছুদিন পরপর বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যাত্রীদের এমন হয়রানি ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় কেন?
অবশ্যই আমাদের বিমানে একজন দক্ষ পাইলট ছিলেন। সবাই তাঁকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু এমন ঘটনা কেন ঘটল, বিমানের ঠিক কোন ত্রুটির কারণে এতগুলো মানুষ প্রাণ হারাতে পারতেন, তা নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন।
তবে বিমান বা আকাশপথ পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থা। অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় উড়োজাহাজে দুর্ঘটনার হার অনেক কম। তাই উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে ভয় পেয়ো না। তবে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উড়োজাহাজের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর শনিবার কক্সবাজার থেকে ৭৫ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়ন করে বাংলাদেশ বিমানের বিজি ৪৩৬ ফ্লাইট। বেলা ১টা ৩৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করার প্রায় আধঘণ্টা পর উড়োজাহাজটির পেছনের একটি চাকায় ত্রুটি দেখা দেয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে পাইলট ঢাকার কন্ট্রোল টাওয়ারে জরুরি বার্তা পাঠান। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রানওয়েতে উড়োজাহাজের ওঠানামা বন্ধ ছিল। এর মধ্যে বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে উড়োজাহাজটি নিরাপদে জরুরি অবতরণ করে। সব যাত্রী ও ক্রু নিরাপদে বিমান থেকে নামেন।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক গোলাম মোর্তজা হোসেন জানান, কক্সবাজার থেকে উড্ডয়নের সময় উড়োজাহাজটির কোনো সমস্যা হয়নি। পেছনের চাকায় যে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, তা ঢাকার আকাশে থাকা অবস্থায় ঘটে।
এ ঘটনায় সাময়িকভাবে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও উড়োজাহাজের ওঠানামা শুরু হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এক বিবৃতিতে জানায়, অনিবার্য পরিচালনগত ও কারিগরি কারণে ফ্লাইটটির সময়সূচিতে বিলম্ব হয়েছিল। সব যাত্রী ও ক্রু নিরাপদে পৌঁছেছেন বলে নিশ্চিত করে সংস্থাটি। ফ্লাইট বিলম্বের কারণে যাত্রীদের যে অসুবিধা হয়েছে, সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। একই সঙ্গে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করে সংস্থাটি।