জনতার প্রেস

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: রূপপুরে দুই মাস ধরে সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা

রূপপুরে অবস্থিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুয়েল লোড বা জ্বালানি স্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রায় দুই মাস ধরে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কিছু পরীক্ষায় নেতিবাচক ফল আসায় সতর্কতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় সব পরীক্ষা নতুন করে চালাতে হচ্ছে। গত ২৮ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে জ্বালানি স্থাপন করা শুরু হয়। গত ১২ মে ১৬৩টি ‘জ্বালানি বান্ডিল’ স্থাপন সম্পন্ন হয়। এর পর থেকেই চলছে বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি ভরার আগে পুরো পাইপলাইন ও চুল্লির ভেসেল উচ্চ পানির চাপে পরীক্ষা করা হয়েছিল। বিভিন্ন পাইপের ভেতর কোনো ময়লা বা কণা আছে কি না, ভাল্‌ভ, পাম্প এবং মোটর সঠিকভাবে কাজ করছে কি না এবং কন্ট্রোল রডগুলো ঠিকমতো ওঠানামা করছে কি না—এসব পরীক্ষা করা হয়েছে। এ ছাড়া ডামি ফুয়েল দিয়ে পুরো ব্যবস্থাটা ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাইয়ে ‘কোল্ড অ্যান্ড হট টেস্ট’ করা হয়েছে। জরুরি অবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বয়ংক্রিয় বন্ধ হওয়ার পদ্ধতিও পরীক্ষা করা হয়েছে। আরও যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে তার মধ্যে আছে জ্বালানি ভরার পর কন্ট্রোল রড অ্যাডজাস্টমেন্ট, শীতলীকরণ ও জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা, কুল্যান্টের রাসায়নিক পরীক্ষা ইত্যাদি। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরমাণুবিজ্ঞানী ড. জাহেদুল হাছান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘চূড়ান্ত নিউক্লিয়ার ফিশন এবং চেইন রি-অ্যাকশন শুরু করার আগে অনেক সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়। এই পরীক্ষাগুলোর কোনো একটায় নেতিবাচক রিপোর্ট এলে সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রাংশ পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয় এবং পরীক্ষাগুলো আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হয়।’ ‘এমন কিছু ভাল্‌ভ আছে, যেগুলোতে ত্রুটি ধরা পড়লে দুই সেকেন্ডের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হয়। এখানে দুই সেকেন্ডের জায়গায় তিন সেকেন্ডের সুযোগ নেই। এ ধরনের সূক্ষ্ম পরীক্ষা এখন চলছে। এই পরীক্ষা কবে শেষ হবে, কবে সফল হব, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না’, বলেন জাহেদুল হাছান। গত রোববার প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেনও বলেন, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনো চলছে। কবে তা শেষ হবে বা কবে নিউক্লিয়ার ফিশন শুরু হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।’ রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আগামী আগস্ট মাসে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। ডিসেম্বর নাগাদ এর পূর্ণ ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াটের মধ্যে ১১০০ মেগাওয়াটই গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা ছিল কর্তৃপক্ষের। কিন্তু পরীক্ষাকালীন সময় লম্বা হতে থাকায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না সন্দেহ দেখা দিয়েছে। নির্ধারণ হয়নি বিদ্যুতের দাম: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কয়েক দফায় ব্যয় বৃদ্ধির পর এতে মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। ব্যয়ের ৯০ শতাংশ অর্থ বহন করছে রাশিয়া। সে অর্থ ঋণ আকারে পরিশোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। কম জ্বালানি খরচ ও দীর্ঘ আয়ুষ্কালের কারণে রূপপুর থেকে উৎপাদিত পরিবেশ অনুকূল বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক কম হবে বলেই আশা করছিলেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণ করা বিএনপি সরকার—কেউই এ পর্যন্ত রূপপুরের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করতে পারেনি। এই বিষয়টিকেও একটি ‘অপ্রস্তুত পরিস্থিতি’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পিডিবির হিসাবে দেশে গ্যাস, কয়লা, ফার্নেস তেল, সৌরবিদ্যুৎ এবং আমদানি বিদ্যুতের মিশ্রণের গড় মূল্য ১২ টাকা ৯১ পয়সা। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ইউনিটপ্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে ইউনিটপ্রতি খরচ ৮ থেকে ১৩ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া ডিজেল ও ফার্নেস তেলভিত্তিক তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১৭ থেকে ২৭ টাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেকগুলো নির্ধারকের কারণে রূপপুরের বিদ্যুতের দাম এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। সমপর্যায়ের অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের মূল্য বিবেচনায় রাখছি। ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফায় এ নিয়ে বৈঠক হয়েছে। দাম নির্ধারণ কোনো সমস্যা হবে না। উৎপাদনে আসার পর যথাসময়ে তা করা হবে।’

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: রূপপুরে দুই মাস ধরে সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা