শিল্পকারখানায় হামলা-ভাঙচুরের ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
খুলনা প্রতিনিধি: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের শিল্পকারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তাদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে জবাব দেবে। দেশের খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে।বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে যাওয়ার পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত এক পথসভায় এসব কথা বলেন তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে যারা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেনি, মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে এবং দেশের অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এখন তারা সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নাড়ছে এবং দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এমনকি দেশের মিল-কারখানা ধ্বংসের ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত হয়েছে।তিনি বলেন, ‘আমরা সব শক্তি দিয়ে খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমিক ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের জবাব দেব। আমাদের সামনে লক্ষ্য একটাই—করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’মিল-কারখানাকে দেশের মানুষের পাশাপাশি শ্রমিকদের সম্পদ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমিকরা। তাই শিল্পকারখানা রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।শ্রমিকদের মজুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া বিবেচনায় ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ড কাজ শুরু করেছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার দেশের সমস্যা সমাধান, শিল্পের প্রসার, ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদার এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করার পাশাপাশি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তরুণ ও যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।তিনি বলেন, একসময় খুলনা ছিল দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। নানা কারণে এ অঞ্চলের অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উত্তরের পঞ্চগড় পর্যন্ত হাজার হাজার শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চায়।মোংলা বন্দরকে অর্থনৈতিক হাব করার পরিকল্পনাএর আগে সকালে মোংলায় ‘মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়নের এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্দরের সক্ষমতা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ জোরদার হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হবে। আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।তিনি বলেন, প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্দরসেবার মান কতটা উন্নত হলো, পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কতটা কমল, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল, তার ওপরই প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে।মোংলা বন্দরের নাব্যতা, নৌ চ্যানেলের নির্ভরযোগ্যতা, জাহাজের নিরাপদ চলাচল ও প্রতিযোগিতামূলক বন্দরসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে বন্দরটিকে আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি উপযুক্ত বাণিজ্যিক ও পরিচালনাগত শর্তে ফার্স্ট কলিং পোর্ট হিসেবে গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি।মোংলা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে খানজাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অংশীজন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।প্রটোকল ভেঙে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীখুলনা সফরকালে কয়েকটি স্থানে প্রটোকল উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে তাকে বহনকারী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা বাসটি রূপসা উপজেলার তিলক কুদির বটতলার পথসভা মঞ্চের পাশে পৌঁছালে অভ্যর্থনার দায়িত্বে থাকা নেতাদের আগেই বাস থেকে নেমে যান তিনি। এরপর সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে হাত মেলান ও কুশল বিনিময় করেন।এ সময় দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। হাজারো মানুষ সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান।পরে বাগেরহাটের পথে কাটাখালী মোড়ের পথসভা শেষে ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন প্রধানমন্ত্রী।খুলনার আইনশৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে গুরুত্ববিকেলে খুলনা মহানগরীর ডাকবাংলা মোড়ে আকস্মিক এক পথসভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সফরসূচিতে না থাকলেও বিএনপি নেতাদের অনুরোধে সেখানে বক্তব্য দেন তিনি।বিকেল ৩টা ২১ মিনিটে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা বাসটি ডাকবাংলা মোড় অতিক্রম করার সময় খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন তাকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। এতে সাড়া দিয়ে বাস থেকে নেমে খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সামনে নির্মিত মঞ্চে যান প্রধানমন্ত্রী।সেখানে তিনি বলেন, খুলনার বন্ধ শিল্পকারখানা দ্রুত চালু করে শিল্পাঞ্চলের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান সমস্যা সমাধান সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।পথসভায় জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিনসহ স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন। এ সময় খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু উপস্থিত ছিলেন।এর আগে সকালে হেলিকপ্টারযোগে মোংলায় পৌঁছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পরে খুলনায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)-এর উদ্বোধন করেন তিনি। সফর শেষে বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশে খুলনা ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী।