জনতার প্রেস

ত্রাণনির্ভরতা কমিয়ে আয়বর্ধক কর্মসূচিতে জোর, ২৫ উপজেলায় পাইলট উদ্যোগ

জনতার প্রেস ডেস্ক: দুর্যোগের পর শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, সরকারি অর্থে খনন ও পুনঃখনন করা খালকে স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে বলেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। একই সঙ্গে ত্রাণ কর্মসূচিকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাবলম্বিতার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দিয়ে চলতি বছর ২৫টি উপজেলায় নতুন ধরনের আয়বর্ধক কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কেআইবি সম্মেলন কেন্দ্রে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।খাল খননেই শেষ নয়, ব্যবহার নিশ্চিত করার তাগিদমন্ত্রী বলেন, সরকারি অর্থে খনন করা খালকে শুধু পানি নিষ্কাশন বা জলাবদ্ধতা নিরসনের অবকাঠামো হিসেবে দেখলে হবে না। এসব খালের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা বিবেচনায় নিতে হবে।তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, খাল খননের পর মাছ চাষসহ স্থানীয় উপযোগী আয়বর্ধক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করা গেলে একদিকে খালের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।তবে এখানেই সামনে আসছে বাস্তবায়নের প্রশ্ন—সরকারি অর্থে খনন করা কতটি খাল বর্তমানে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কতগুলো আবার পলি পড়ে বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং নতুন আয়বর্ধক মডেলের সুফল কারা পাবেন?২৫ উপজেলায় পরীক্ষামূলক কর্মসূচিত্রাণমন্ত্রী জানান, নতুন আয়বর্ধক উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতে প্রাথমিকভাবে চলতি বছর ২৫টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পরে এসব উদ্যোগের ফলাফল মূল্যায়ন করে সফল কর্মসূচি অন্যান্য এলাকায় সম্প্রসারণের কথা ভাবা হবে।তিনি বলেন, শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই একটি প্রকল্প সফল হয়েছে বলা যাবে না। প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের আয় কতটা বাড়ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কি না এবং উপকারভোগীরা কতটা স্বাবলম্বী হচ্ছেন—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।এই অবস্থান বাস্তবায়িত হলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচির সাফল্য পরিমাপের প্রচলিত ধারণাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে বা কতটি অবকাঠামো তৈরি হয়েছে—তার পাশাপাশি কতজনের আয় বেড়েছে, কতটি স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কার্যক্রম টিকে আছে কি না, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে।মাশরুম চাষকে উদাহরণআয়বর্ধক কর্মসূচির উদাহরণ হিসেবে মাশরুম চাষের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, তুলনামূলক কম পুঁজিতে মাশরুম চাষ শুরু করা সম্ভব এবং এর বাজারও রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে আয় বাড়াতে পারেন।তিনি বলেন, শীত মৌসুমেও মাশরুম চাষ করা সম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে ছোট পরিসরে উদ্যোগ শুরু করে ধীরে ধীরে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।তবে কোনো একটি সফল উদ্যোগকে বড় পরিসরে নেওয়ার আগে স্থানীয় বাজার, প্রশিক্ষণ, উৎপাদন ব্যয়, সংরক্ষণ ও বিপণনব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই কতটা করা হচ্ছে—সেটিও এই কর্মসূচির কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।১০ কেজি চাল থেকে ২০ কেজির প্রস্তাবদরিদ্র মানুষের খাদ্য সহায়তার পরিমাণ নিয়েও নতুন করে ভাবার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, বর্তমান বাজারমূল্যের বাস্তবতায় ১০ কেজি চালের সহায়তা অনেক পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নয়।এ কারণে খাদ্য সহায়তায় চালের পরিমাণ ১০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ২০ কেজি করার একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ জন্য অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে এবং বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা চলছে।এখানে বড় প্রশ্ন হলো—অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে এবং চালের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি আয়বর্ধক কর্মসূচিতে বিনিয়োগের মধ্যে কী ধরনের ভারসাম্য রাখা হবে? কারণ দীর্ঘমেয়াদি স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে শুধু খাদ্য সহায়তা বাড়ানো নয়, কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টির ব্যবস্থাও কার্যকর করা প্রয়োজন।ব্যাংকের মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছানোর পরিকল্পনাসরকারি সহায়তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন আসাদুল হাবিব দুলু।তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার বাড়ানো গেলে অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে।তবে ডিজিটাল বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকা মানুষ—বিশেষ করে দুর্গম ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী—কীভাবে এ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হবে, সেটিও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।কাবিখা-কাবিটায় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবকাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী।তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তা, জীবনযাত্রা ও প্রয়োজন পরিবর্তিত হয়েছে। তাই দীর্ঘদিনের সরকারি কর্মসূচির নাম ও কাঠামোও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যেতে পারে।এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। কমিটিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রধান এবং মহাপরিচালককে সদস্য সচিব করার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিকেও এতে রাখা হতে পারে।পুনর্বাসনে ‘নিজ এলাকায় স্বাবলম্বিতা’র ওপর জোরদুর্যোগপ্রবণ মানুষের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও শুধু ঘর নির্মাণকে যথেষ্ট মনে করছেন না মন্ত্রী। তাঁর মতে, মানুষকে নিজ সমাজ ও পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা স্থানে পুনর্বাসনের পরিবর্তে নিজ এলাকায় থেকেই আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।তিনি বলেন, পুনর্বাসনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক যোগাযোগের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।এই নীতির সফলতা নির্ভর করবে পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর জন্য বাস্তবে কতটা আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায় তার ওপর। শুধু ঘর নির্মাণের পর প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাবলম্বিতার লক্ষ্য পূরণ হবে না।এখন নজর বাস্তবায়নেত্রাণমন্ত্রী যে পরিবর্তনের কথা বলছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—দুর্যোগের পর মানুষকে বারবার সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে তারা নিজেরাই আয় করতে পারেন।কিন্তু এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি: ২৫ উপজেলায় কোন মানদণ্ডে এলাকা নির্বাচন করা হবে, প্রতিটি কর্মসূচিতে কত অর্থ ব্যয় হবে, উপকারভোগী নির্বাচন কীভাবে হবে, খালভিত্তিক আয়বর্ধক কার্যক্রমের মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার হাতে থাকবে এবং প্রকল্প ব্যর্থ হলে তার দায় নির্ধারণের ব্যবস্থা কী হবে।মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও যথাযথ তদারকির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।এখন সেই নির্দেশনা মাঠে কতটা বাস্তব রূপ পায়, সেটিই হবে নতুন উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।জনতার প্রেস | জাতীয় ডেস্ক

ত্রাণনির্ভরতা কমিয়ে আয়বর্ধক কর্মসূচিতে জোর, ২৫ উপজেলায় পাইলট উদ্যোগ