বিয়ের আনন্দের বাড়িতে শোকের মাতম, পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু
রংপুর প্রতিনিধি:রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি গ্রামে পুকুরে ডুবে মামাতো-ফুফাতো দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে তিনটার দিকে স্থানীয় একটি পুকুর থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।নিহত দুই শিশু হলো—রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার চম্পাতলী মিস্ত্রিপাড়া গ্রামের রুপা রানী (১০) এবং তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের কাচনা গ্রামের পঞ্চমী রানী রায় (৮)। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো বোন।বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছিল দুই শিশুপরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার দিবাগত রাতে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি গ্রামের রতন চন্দ্র রায়ের সঙ্গে তারাগঞ্জের কাংলাচড়া গ্রামের এক তরুণীর বিয়ে হয়।বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রতনের বোন ওমালা রানী তার ১০ বছরের মেয়ে রুপাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আসেন। একইভাবে আট বছরের মেয়ে পঞ্চমীকে নিয়ে তারাগঞ্জের কাচনা গ্রাম থেকে আসেন রতনের বড় ভাই অজয়ের শ্যালিকা মিনতি রানী রায়।নতুন বউকে ঘিরে বাড়িতে তখন চলছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাস। বুধবার বরের বাড়িতে ফিরানি অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকায় স্বজনদের অনেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন।গোসল করতে গিয়ে আর ফেরেনিস্বজনরা জানান, বুধবার বেলা দেড়টার দিকে রুপা ও পঞ্চমী গোসল করতে পুকুরে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। পরে তারা আর বাড়িতে ফিরে না আসায় স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই শিশু আরাজি গ্রামের সুধীর রায়ের পুকুরে গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় তাদের কোনো সন্ধান না পেয়ে স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও পুকুরে নেমে অনুসন্ধান শুরু করেন।একপর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে পুকুরের পানির নিচ থেকে রুপা ও পঞ্চমীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।‘মেয়েকে বিয়ের আনন্দ দেখাতে এনেছিলাম, এখন লাশ নিয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরব’মেয়ে রুপার মরদেহের পাশে বিলাপ করতে করতে মা ওমালা রানী বলেন, মামার বিয়েতে আনন্দ করবে—এ জন্য মেয়েকে সঙ্গে করে বাবার বাড়িতে এসেছিলেন তিনি।তিনি বলেন, ‘মেয়েটা আমার সঙ্গে কথা বলছে না, মা ডাকছে না। মেয়েটা আমার সামনে পড়ে আছে। মেয়েকে বিয়ের আনন্দ দেখাতে এনেছিলাম, এখন মেয়ের লাশ নিয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরব? কাকে নিয়ে বাঁচব, ভগবান।’অন্যদিকে মেয়ে পঞ্চমীকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন মা মিনতি রানী। জ্ঞান ফেরার পর মেয়ের মরদেহের কাছে ছুটে যেতে চাইলে স্বজনরা তাকে ধরে রাখেন।এ সময় বিলাপ করে মিনতি রানী বলেন, ‘বিয়ার খুশি মোর কপালো দুঃখ আনিল। মুই এখন মাওক (মেয়ে) কোনঠে পাইম। ওর বাপোক কী জবাব দেইম। মোর মাও কথা কওছে না কেন। তোরা মোর মাওক আনি দেন।’বিয়ের বাড়িতে এখন শোকের মাতমস্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল হোসেন বলেন, নতুন বউকে ঘিরে যে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড় ছিল, সেই উঠানেই এখন শোকের পরিবেশ। ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। স্থানীয় লোকজনই পুকুর থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছেন।তিনি জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং বিষয়টি দেখভাল করে।এ ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আনন্দের বিয়ের আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে।জনতার প্রেস | রংপুর