হাজারো প্রদীপের আলোয় আলোকিত বরিশালের মহাশ্মশান, প্রয়াত স্বজনদের স্মরণে আবেগঘন মিলনমেলা
গোধূলির শেষ আলো মিলিয়ে যেতেই নেমে আসে সন্ধ্যার অন্ধকার। সেই আঁধার ভেদ করে একে একে জ্বলে ওঠে হাজারো প্রদীপ ও মোমবাতি। আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে সারি সারি সমাধি। কোথাও ধূপ-আগরবাতির সুবাস, কোথাও ফুলের অর্ঘ্য। আবার কোথাও প্রিয়জনের সমাধির পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে স্মৃতিচারণ করছেন স্বজনেরা।বরিশাল নগরের কাউনিয়া এলাকার মহাশ্মশানে শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় দীপাবলি উৎসবে দেখা যায় এমনই এক আবেগঘন দৃশ্য। প্রয়াত মা-বাবা, সন্তান, জীবনসঙ্গী ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তসহ বিদেশ থেকেও ছুটে আসেন হাজারো মানুষ।শুধু প্রদীপ জ্বালানো কিংবা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয় এ আয়োজন। অনেকেই প্রয়াত স্বজনদের পছন্দের খাবার নিয়ে আসেন। সমাধির পাশে সাজিয়ে রাখেন ইলিশ, পায়েসসহ নানা ধরনের খাবার। প্রার্থনা, স্মৃতিচারণ আর স্বজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ে দুই দিনব্যাপী এ আয়োজন পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়।বরিশালের পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকায় প্রায় ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত এ মহাশ্মশানের ইতিহাস নগর প্রতিষ্ঠারও আগের। ইতিহাস অনুযায়ী, ধনাঢ্য জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় প্রথমে নতুন বাজার এলাকায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে কাউনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটে। প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন এ মহাশ্মশানে রয়েছে ৭০ হাজারের বেশি মঠ ও সমাধি। এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্মশান হিসেবে পরিচিত।১৯২৭ সাল থেকে এখানে দীপাবলি উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে। কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর পুণ্য তিথিতে প্রতিবছর এ আয়োজন করা হয়। প্রয়াত স্বজনদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এখানে আসেন। অনেকের কাছে এ উৎসব শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া এবং হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর এক বিশেষ উপলক্ষ।ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শনবরিশালের এ মহাশ্মশানের রয়েছে বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব। এখানে সমাহিত আছেন কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ। এ ছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ ও মনোরমা বসুসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সমাধি রয়েছে এখানে।মৃত্যুর প্রায় ৮০ বছর পর ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে বাঙালি রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও লেখক অশ্বিনীকুমার দত্তের চিতাভস্ম এনে এখানেই সংরক্ষণ করা হয়।স্মৃতির টানে ফিরে আসেন স্বজনেরামহাশ্মশানে শায়িত ব্যক্তিদের স্বজনদের কাছে দিনটি আবেগ ও স্মৃতিচারণের। প্রতিবছর চতুর্দশী তিথিতে প্রয়াত স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনা এবং তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এখানে ছুটে আসেন তাঁরা। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণে তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ।প্রিয়াংকা নন্দী নামের এক নারী প্রয়াত স্বজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মহাশ্মশানে এসেছেন। তিনি বলেন, আত্মীয়স্বজনের আত্মার শান্তি কামনা এবং তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই প্রতিবছর তাঁরা এখানে আসেন। জীবনের নানা ব্যস্ততার মধ্যেও এই দিনে আপনজনদের কাছে ফিরে আসার চেষ্টা করেন তাঁরা।কাউনিয়া মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সভাপতি অসীম কুমার দাস মুরালী বলেন, দীপাবলি উপলক্ষে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও দর্শনার্থীরা এ আয়োজনে অংশ নেন। তাঁদের আগমনকে কেন্দ্র করে মহাশ্মশান এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।নিরাপত্তায় পুলিশের ৩০০ সদস্যবিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুরো মহাশ্মশান এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার বলেন, মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসবের নিরাপত্তায় পুলিশের প্রায় ৩০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া সাদাপোশাকে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন।জনতার প্রেস | জনতার কথা, জনতার সংবাদ।