কফি কি সত্যিই হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমায়
ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি যেন শুধু পানীয় নয়, চনমনে হয়ে ওঠার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এর গাঢ় সুবাস, তিক্ত-মধুর স্বাদ আর উষ্ণতার স্পর্শ শত শত বছর ধরে মানুষকে মুগ্ধ করে চলেছে। জীবনযাপনের সঙ্গে মিশে যাওয়া এই মোহময় পানীয়কে ঘিরে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি—কখনো ইথিওপিয়ার এক রাখাল বালকের বিস্ময়কর আবিষ্কারের গল্প, কখনো সুফি সাধকদের রাতজাগা সাধনায় কফির ভূমিকার গল্প। ইতিহাস, লোককথা ও সংস্কৃতির মিশেলে কফি আজ শুধু এক পানীয় নয়, বিশ্বসভ্যতার এক অনন্য প্রতীক। সেই সঙ্গে কফি নিয়ে গড়ে উঠেছে স্বাস্থ্যগত বিষয়ে বহু মিথ। এই পানীয়কে নিয়ে হয়েছে প্রচুর গবেষণা।
একসময় ধারণা করা হতো, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য কফিতে থাকা ক্যাফেইন ক্ষতিকর। সম্প্রতি আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের বৈজ্ঞানিক বিবৃতিতে উঠে এসেছে এক নতুন চিত্র। সেখানে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জানা গেছে, পরিমিত পরিমাণে কফি পান প্রকৃতপক্ষে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষক এবং একদল হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ আগের একাধিক বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও ডেটা বিশ্লেষণ করে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে এই বৈজ্ঞানিক মতামতটি প্রকাশ করেন। গবেষকদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দৈনিক গড়ে ৩-৫ কাপ পরিমাণ কফি বা প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন নিরাপদে পান করতে পারেন। নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সহযোগী ক্লিনিক্যাল প্রফেসর স্টিফেন উড বলেন, ‘কফিকে এত দিন হৃদ্রোগের যে প্রধান খলনায়ক হিসেবে দেখা হতো, এই গবেষণা মূলত সেই ভুল ধারণা সংশোধন করেছে।’ তবে এনার্জি ড্রিংকস বা কৃত্রিম উচ্চ-ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা প্রযোজ্য নয়।
কফিতে শুধু ক্যাফেইনই থাকে, এমন নয়। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং পলিফেনলের মতো প্রদাহবিরোধী উপাদান। এগুলো শরীরের রক্তনালির কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পর্যালোচনা অনুযায়ী, নিয়মিত পরিমিত কফি পান করলে করোনারি হার্ট ডিজিজ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। দৈনিক ৪ কাপ কফি স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। দিনে ৫ কাপ কফি পানে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে। কফি হৃৎস্পন্দনের গতি সাময়িকভাবে সামান্য বাড়ালেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি হার্ট ফেলিউরের ঝুঁকি কমায়।
গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই উপকারিতা কেবল শর্করা ও দুধ ছাড়া ব্ল্যাক কফির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ফিল্টার কফি বা ইনস্ট্যান্ট কফি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর। কিন্তু কফিতে অতিরিক্ত চিনি, ফ্লেভারড সিরাপ কিংবা ক্রিম যোগ করলে এর স্বাস্থ্যকর গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া ফিল্টার ছাড়া কফি কোলেস্টেরলের মাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন ফ্রেন্স প্রেস। সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে এনার্জি ড্রিংকস বা কৃত্রিম ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় নিয়ে। এনার্জি ড্রিংকসে সাধারণ কফির চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি ঘনীভূত ক্যাফেইন থাকে। গবেষকদের মতে, এই ঘন ক্যাফেইন এবং এর সঙ্গে থাকা টরিন নামক উপাদান হৃদ্যন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন এমনকি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
কফি পানের কোনো একক সর্বজনীন নিয়ম নেই। ক্যাফেইন হজমের ক্ষমতা মানুষভেদে আলাদা। জিনগত বৈশিষ্ট্য, বয়স, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সমস্যা থাকলে কফির পরিমাণ কমিয়ে আনা উচিত। একজন মানুষের জন্য ৫ কাপ কফি সহনীয় হলেও অন্যজনের ক্ষেত্রে তা বুক ধড়ফড় করা, ঘুমের ব্যাঘাত বা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। সুতরাং, আপনি যদি কফিপ্রেমী হন, তবে চিনি ও ফ্লেভার এড়িয়ে দিনে ৩-৪ কাপ কফি উপভোগ করতেই পারেন—যা আপনার হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ফিল্টার্ড বা ফিল্টার করা কফি পান করা স্বাস্থ্যের পক্ষে ইনস্ট্যান্ট কফির চেয়ে বেশি উপকারী। এটি বার্ধক্যের প্রক্রিয়া ধীর করতে পারে—এমনটাই উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। এনপিজে ‘সায়েন্স অব ফুড’ জার্নাল-এ প্রকাশিত এক গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, ফিল্টার্ড কফিতে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিডের মতো অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও মেটাবলিক উপাদান বেশি থাকে। এই উপাদান শরীরের জৈবিক বয়স বৃদ্ধি ধীর করে। অন্যদিকে ইনস্ট্যান্ট কফি পানকারীদের ক্ষেত্রে জৈবিক বয়সের হার কিছুটা বেশি দেখা গেছে, বিশেষ করে বয়স্ক, পুরুষ ও ধূমপায়ীদের মধ্যে। দিনে ৩ কাপের বেশি ফিল্টার্ড কফি খেলে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বেশি।
সূত্র: ওয়েব মেড, ডেইলি মেইল