তাহাজ্জুদ যখন রবের সঙ্গে বান্দার একান্ত সাক্ষাৎ
দিনের ব্যস্ততায় আমরা অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা করি, নানা দায়িত্ব পালন করি, অসংখ্য কথোপকথনে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। কিন্তু এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা সবার জন্য নয়— শুধু আপনজনদের জন্য। গভীর রাতের নীরবতা ঠিক তেমনই একটি সময়।
অনেকে সুন্দর একটি উপমা ব্যবহার করেন— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যেন আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের নির্ধারিত সময়, আর তাহাজ্জুদ যেন সেই নিভৃত সময়, যখন কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; থাকে শুধু ভালোবাসা, অশ্রু, আত্মসমর্পণ আর বান্দা-রবের একান্ত কথোপকথন। যদিও এটি কুরআন বা হাদিসের ভাষা নয়, তবুও এর ভেতরে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে— যে বান্দা স্বেচ্ছায় ঘুম ছেড়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, সে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভের পথে অগ্রসর হয়।
যখন পৃথিবী ঘুমায়, তখন জেগে থাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা
রাতের শেষ প্রহর— চারদিকে নিস্তব্ধতা। নেই মানুষের কোলাহল, নেই দুনিয়ার ব্যস্ততা। এই সময় একজন মুমিন যখন অজু করে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, তখন সে পৃথিবীর সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে শুধু তার রবের সঙ্গে কথা বলে। এ সময়ের ইবাদত লোক দেখানোর নয়, প্রশংসা পাওয়ার নয়। এটি এমন এক ইবাদত, যার সাক্ষী কেবল আল্লাহ।
তাহাজ্জুদের মর্যাদা কুরআনের আলোকে
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ ۖ عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا
‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, আপনার রব আপনাকে প্রশংসিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৭৯)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
‘তারা রাতের খুব অল্প সময়ই ঘুমাত এবং শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা আয-যারিয়াত: আয়াত ১৭–১৮)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, রাতের ইবাদত ছিল আল্লাহর নেক বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর বিশেষ আহ্বান
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ، فَيَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ؟ وَمَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ؟ وَمَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ؟
‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন, অতঃপর বলেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছে যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?’ (বুখারি ১১৪৫, মুসলিম ৭৫৮)
এটি এমন এক ঘোষণা, যা প্রতিটি ইমানদারের হৃদয়কে নাড়া দেয়। পৃথিবীর কোনো রাজা তার প্রজাদের এভাবে ডেকে বলে না—‘এসো, তোমার যা দরকার চাও।’ অথচ সৃষ্টিকর্তা নিজেই তার বান্দাদের আহ্বান জানাচ্ছেন।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনআপনি কি নিজের নফসের ধোঁকায় পড়ছেন? কয়েকটি প্রশ্ন করুন নিজেকে
তাহাজ্জুদ: ভালোবাসার সবচেয়ে নীরব ভাষা
ভালোবাসার একটি বৈশিষ্ট্য হলো— ভালোবাসার মানুষটির জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় কষ্ট স্বীকার করে। শীতের রাতে উষ্ণ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো সহজ নয়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে অজু করা সহজ নয়। কিন্তু যে হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা জেগে ওঠে, তার কাছে এই কষ্টই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মধুর ইবাদত।
তাহাজ্জুদ আমাদের শেখায়—আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে উচ্চস্বরে নয়, বিনম্র হৃদয়ই যথেষ্ট।
কেন আমাদের জীবনে তাহাজ্জুদ থাকা উচিত?
তাহাজ্জুদ—
যে ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে আল্লাহকে স্মরণ করে, আল্লাহ তার অন্তরকে এমন আলোয় ভরিয়ে দেন, যা পৃথিবীর কোনো আলো দিতে পারে না।
ছোট্ট একটি শুরুই হতে পারে বড় পরিবর্তনের সূচনা
অনেকেই মনে করেন, তাহাজ্জুদ মানেই দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ পড়তে হবে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। প্রথমে সপ্তাহে এক বা দুই দিন চেষ্টা করুন। দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন। কয়েক মিনিট মন খুলে দোয়া করুন। ধীরে ধীরে এই ইবাদত আপনার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সময়ে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ ধারাবাহিক আমলকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ
‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো, যা নিয়মিত করা হয়— যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (বুখারি ৬৪৬৪, মুসলিম ৭৮২)
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একজন মুসলমানের অপরিহার্য ফরজ ইবাদত—এটি কখনোই অবহেলার বিষয় নয়। আর তাহাজ্জুদ হলো সেই অতিরিক্ত ইবাদত, যা একজন বান্দাকে আল্লাহর আরও নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়।
হয়তো আপনার জীবনে এমন কিছু দুঃখ আছে, যা কাউকে বলতে পারেন না। এমন কিছু অশ্রু আছে, যা কেউ দেখে না। এমন কিছু দোয়া আছে, যা এখনো পূরণ হয়নি। আজ রাতেই সেই কথাগুলো মানুষের কাছে নয়, আপনার রবের কাছে বলুন।
হয়তো পৃথিবীর সবাই ঘুমিয়ে থাকবে, কিন্তু আসমানের দরজা তখনও খোলা থাকবে। হয়তো আপনার চোখের একটি অশ্রুবিন্দুই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়ে যাবে।
আসুন, রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলি। কারণ যে হৃদয় সিজদায় কান্না করতে শেখে, সে হৃদয় কখনো সত্যিকারের নিঃস্ব থাকে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।