জনতার প্রেস

১ লাখ কর্মী ছাঁটাই করবে ফক্সওয়াগন, বন্ধের মুখে ৪ কারখানা

জার্মানির ঐতিহ্যবাহী গাড়ি নির্মাতা জায়ান্ট ফক্সওয়াগন গ্রুপ বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ লাখ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। ফক্সওয়াগন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী (সিইও) অলিভার ব্লুম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পোর্শে, অডি, সিয়াট এবং স্কোডার মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠান ফক্সওয়াগন এর আগে জানিয়েছিল, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে জার্মানিতে প্রায় ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সংখ্যা ১ লাখে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত বিশ্ববাজারে বিক্রি কমে যাওয়া এবং ইউরোপের বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যের চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে গত বছর ফক্সওয়াগনের মুনাফায় বড় ধরনের ধস নামে। কর্মীদের কাছে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ চিঠিতে (মেমো) সিইও অলিভার ব্লুম উল্লেখ করেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় ফক্সওয়াগনের পরিচালন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে যেকোনো মূল্যে খরচ কমাতে হবে। এই খরচ হ্রাসের অংশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে তাত্ত্বিকভাবে আরও ৫০ হাজার কর্মী চাকরি হারাতে পারেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। অলিভার ব্লুম বলেন, ‘আমাদের সব ব্র্যান্ড, সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং অঞ্চলগুলোতে কী পরিমাণ কর্মী হ্রাস বা সমন্বয় করা প্রয়োজন ও সম্ভব, তা আমরা খতিয়ে দেখছি। আমাদের আরও দক্ষ, শক্তিশালী এবং সহজ প্রক্রিয়ায় কাজ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে আমাদের ব্যয় কমাতে হবে।’ প্রধান নির্বাহী আরও জানান, জার্মানির যে চারটি কারখানা আগে থেকেই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল, সেগুলোর বিকল্প ব্যবহারের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এই চার কারখানার মধ্যে জুইকাউ এবং এমডেন মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির জন্য ব্যবহৃত হতো। বাকি দুটি কারখানা হ্যানোভার ও নেকারসুলমে অবস্থিত। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই কারখানাগুলো পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ২০২৩: ████████████████████████████ ২২.৬ বিলিয়ন ইউরো ২০২৪: ███████████████████████ ১৯.১ বিলিয়ন ইউরো ২০২৫: ██████████ ৮.৯ বিলিয়ন ইউরো তথ্যসূত্র: ফক্সওয়াগন গ্রুপ ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফক্সওয়াগনের মুনাফায় বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফা ছিল ২২.৬ বিলিয়ন ইউরো ($২৫.৮ বিলিয়ন ডলার), সেখানে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৯.১ বিলিয়নে। আর গত বছর তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে মাত্র ৮.৯ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। ফক্সওয়াগনের সবচেয়ে বড় এবং লাভজনক বাজার ছিল চীন। কিন্তু সেখানে বছরের প্রথম ছয় মাসেই গাড়ি বিক্রি কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত আমদানি শুল্কের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও গাড়ি বিক্রি কমেছে ৭ শতাংশের বেশি। একই সময়ে চীনা ব্র্যান্ডগুলো অত্যন্ত সাশ্রয়ী উৎপাদন খরচের সুবিধা নিয়ে এবং উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি নিয়ে ইউরোপসহ বিশ্ববাজারে আগ্রাসীভাবে প্রবেশ করছে। ফলে ফক্সওয়াগনের মতো প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলো মুনাফার মার্জিন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের শেষভাগে, ব্যাপক ধর্মঘটের আশঙ্কার মুখে ফক্সওয়াগন কর্তৃপক্ষ জার্মানির প্রভাবশালী ট্রেড ইউনিয়ন ‘আইজি মেটাল’-এর সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল। ওই চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ফক্সওয়াগন ব্র্যান্ড থেকে ৩৫ হাজার এবং সহযোগী অন্যান্য ব্র্যান্ড থেকে ১৫ হাজার কর্মী ‘সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল উপায়ে’ ছাঁটাই করার কথা ছিল। তবে বর্তমান নতুন পরিকল্পনা পূর্বের চুক্তিকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। গত সপ্তাহে ফক্সওয়াগনের সুপারভাইজরি বোর্ডের (যেখানে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি শ্রমিক প্রতিনিধিরাও রয়েছেন) বৈঠকের আগে জার্মানির বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকেরা ব্যাপক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কয়েকজন শিল্প বিশ্লেষক বলেছেন, ১ লাখ কর্মী ছাঁটাইয়ের এই বিশাল সংখ্যাটি ফক্সওয়াগন কর্তৃপক্ষ হয়তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করছে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষিতে বাড়তি সুবিধা পেতেই এই কৌশল নেওয়া হয়ে থাকতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ছাঁটাইয়ের সংখ্যা এর চেয়ে কিছুটা কম হতে পারে।

১ লাখ কর্মী ছাঁটাই করবে ফক্সওয়াগন, বন্ধের মুখে ৪ কারখানা