জনতার প্রেস

ঘুষের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত, শাস্তির আগেই অবসরের আবেদন ভূমি কর্মকর্তার

জনতার প্রেস |  মানিকগঞ্জ প্রতিনিধিমানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দরগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) আব্দুল মোতালেবের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই মাস আগে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেছেন তিনি। এদিকে বিভাগীয় শাস্তি থেকে রেহাই পেতে প্রায় ১০ লাখ টাকা লেনদেনের চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।গত ৯ সেপ্টেম্বর ‘টাকা ছাড়া মেলে না সেবা, ভূমি কর্মকর্তার ঘুষ গ্রহণের ভিডিও প্রকাশ্যে’ শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে নামজারিসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়ার নামে ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠে আসে। অফিসে বসে টাকা গোনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।অভিযোগ তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলামকে।গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত শুনানিতে অভিযোগকারী, সাংবাদিক ও অভিযুক্ত নায়েবের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। পরে তদন্ত শেষে জেলা প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন ইউএনও।কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, ‘তদন্তে আব্দুল মোতালেবের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।’তবে তদন্ত প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হয়েছে, তা জানা যায়নি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত, বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নতদন্তে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও প্রায় এক মাস ধরে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের অভিযোগ, অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে শাস্তি থেকে রেহাই দিতে প্রায় ১০ লাখ টাকা লেনদেনের চেষ্টা চলছে।ভূমি প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আব্দুল মোতালেব শাস্তি এড়াতে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করার চেষ্টা করছেন বলে তিনি শুনেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লেনদেনের অঙ্ক প্রায় ১০ লাখ টাকা। তবে এ ধরনের অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। চাকরি ছাড়ার আবেদন নায়েবেরচাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেছেন আব্দুল মোতালেব। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার চাকরির আর মাত্র কয়েক মাস সময় আছে। আমি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেব। নিউজে আমার কিছুই হবে না।’তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বিষয়টি এমন নয়। সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হলে অনেক সময় বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শাখায় বিস্তারিত জানতে পারবেন।’অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। আব্দুল মোতালেব স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার আবেদন করেছেন বলেও তিনি শুনেছেন।মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘চাকরি ছেড়ে দেওয়াটাই বড় শাস্তি। তদন্তের পর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলতে পারে।’তদন্ত চলাকালে কিংবা অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও আব্দুল মোতালেবকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি কেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলে সাময়িক বরখাস্ত করা যায়। তবে তদন্তের পর সাধারণত বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যা সময়সাপেক্ষ। নামজারিতে হয়রানি ও ঘুষ দাবির অভিযোগএর আগে একাধিক সেবাপ্রার্থী আব্দুল মোতালেবের বিরুদ্ধে নামজারিসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা দিতে ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নানা অজুহাতে আবেদন আটকে রাখা হতো। কখনো অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হতো, আবার কখনো ভুলের কথা বলে আবেদন বাতিল করা হতো। পরে চাহিদামতো টাকা দিলে দ্রুত সেবা পাওয়া যেত।ভুক্তভোগী আনছের আলী বলেন, ‘নামজারি করার জন্য আমি দেড় বছর ঘুরেছি। বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে আমার আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয়। পরে পাশের একটি রুমে নিয়ে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দেওয়ার পরই আমার নামজারি করে দেওয়া হয়। দেড় বছর ঘুরে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি।’স্থানীয়দের দাবি, এর আগেও সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে ওই কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করা হয়েছিল। সে সময় ভবিষ্যতে এমন কর্মকাণ্ডে জড়াবেন না বলে তাঁর কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়। অবসরের আগে শেষ হবে কি বিভাগীয় প্রক্রিয়া?ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা, শাস্তি এড়াতে অর্থ লেনদেনের চেষ্টার অভিযোগ এবং স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান থাকলে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন কীভাবে বিবেচিত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বিভাগীয় প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অবস্থা জানা যায়নি।চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আব্দুল মোতালেবের বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে কি না, নাকি অবসরের আবেদন নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে বিষয়টি নতুন জটিলতায় পড়বে—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

ঘুষের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত, শাস্তির আগেই অবসরের আবেদন ভূমি কর্মকর্তার