ইসির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জামায়াতের তীব্র অসন্তোষ: ৯ দফার চিঠি দিয়ে কড়া বার্তা।
স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপে ‘মারাত্মক রাজনৈতিক চাপের’ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে সংস্থাটির আজ্ঞাবহ ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছে দলটি। একই সাথে বিতর্কিত প্রশাসনিক নিয়োগ বাতিল, শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থিতার সুযোগ বহাল রাখাসহ ৯ দফা দাবি সম্বলিত একটি চিঠি ইসির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে জামায়াতের এক প্রতিনিধিদলের বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।ইসির নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগসংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সংবিধান কমিশনকে বিপুল ক্ষমতা দিলেও তারা সেই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না। ইসির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে তারা মারাত্মক রাজনৈতিক চাপে রয়েছে বলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।কমিশনের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন:"চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সরোয়ার আলমের গেজেট ও শপথের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশের কপি বা বিচারপতির স্বাক্ষর করা নির্দেশ হাতে আসার আগেই রাজনৈতিক প্রভাবে মাত্র ২-৪ ঘণ্টার মধ্যে গেজেট জারি ও শপথের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি কমিশনের চরম অস্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।"বিতর্কিত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের দাবিইসি সচিবালয়ে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব সামসুল আলমের নিয়োগ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানায় জামায়াত। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সামসুল আলম একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাবেক সিনিয়র নেতা এবং বিগত সংসদ নির্বাচনে সরাসরি আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন।জামায়াত প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সাফ জানিয়ে দেয় যে, এমন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া আগামী নির্বাচনকে একপেশে ও পক্ষপাতমূলক করার এক সুনির্দিষ্ট চক্রান্ত। সিইসি উক্ত কর্মকর্তার পূর্ব রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করলেও জামায়াত প্রতিনিধি দল দাবি করে, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসি চাইলেই এই বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করতে পারে।এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার প্রতিবাদস্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের অযোগ্য ঘোষণা সংক্রান্ত ইসির সাম্প্রতিক সুপারিশকে চরম বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে জামায়াত।
সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক: শিক্ষকরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন পারবেন না—এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে দলটি।
সংলাপহীন সিদ্ধান্ত: কোনো রাজনৈতিক দল বা স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা ছাড়াই ইসি কেন এমন শিক্ষকবিরোধী নীতি তৈরি করলো, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
ইসির আশ্বাস: কমিশন বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছে।
তফশিল ও অন্যান্য দাবিসমূহনির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপিদের বক্তব্যকে বেআইনি হস্তক্ষেপ উল্লেখ করে জামায়াত জানায়, দিনক্ষণ নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার ইসির। ইসিকে তার নিজস্ব ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের তাগিদ দেয়া হয়।জামায়াতের মূল দাবিসমূহ:
রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সদস্য বা পদধারীদের ব্যক্তি পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বন্ধ করা।
সুবিধাজনক পদের অপব্যবহার: স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় সুবিধাজনক পদে থাকা ব্যক্তিদের প্রার্থিতায় অযোগ্য ঘোষণা করা।
এমপি-মন্ত্রীদের প্রভাব: নির্বাচনে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের সরাসরি প্রভাব বিস্তার বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা।
বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য ও যশোর ইস্যুরাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যান্য বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াত সেক্রেটারি সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কৃত এক সংসদ সদস্যের বিষয়ে জানান, দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে যা চূড়ান্ত। এখন তার আসন থাকা না থাকার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়, যা স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার।এছাড়া, যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের পারিবারিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বাড়িতে হামলা ও পরিবারকে হেনস্তা করার প্রতিবাদ জানিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বদলে গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে সিইসি ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ এবং ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। জামায়াত প্রতিনিধিদলে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মোয়াজ্জেম হোসেন হেলালসহ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।