বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন ভারতের তরুণদের পথ দেখিয়েছে, নেহার বক্তব্যে রাহুলকে নিশানা বিজেপির
জনতার প্রেস | আন্তর্জাতিক ডেস্কবাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ভারতের তরুণদের আন্দোলনে পথ দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা। বাংলাদেশের বামপন্থী সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য এবং আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে নতুন করে আক্রমণ করেছে।গত ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষে নেহা বোরার ভিডিওবার্তাটি সম্প্রতি সংগঠনটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। সেখানে বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ভারতের তরুণদের চলমান আন্দোলনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।বিজেপির অভিযোগ, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতি ভারতে তৈরির চেষ্টা করছেন রাহুল গান্ধী ও তাঁর রাজনৈতিক সহযোগীরা। তবে নেহার বক্তব্যের সঙ্গে রাহুল গান্ধীর সরাসরি কোনো সম্পর্কের প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
বাংলাদেশকে আন্দোলনের পথপ্রদর্শক বললেন নেহাভিডিওবার্তায় নেহা বোরা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সম্মেলনে বিপ্লবী শুভেচ্ছা ও লাল সালাম জানান। এরপর বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ভারতে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের যে আন্দোলন চলছে, তার সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশের তরুণেরাই তাঁদের আন্দোলনের পথ দেখিয়েছেন।নেহা বলেন, “আমরা জানি, আমাদের দেশে যে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন চলছে, তা প্রথম শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে। তারাই আমাদের এই আন্দোলনের পথ দেখিয়েছে।”২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের জন্য বাংলাদেশের তরুণদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। একইভাবে ভারতেও গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটাধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলন চলছে।বাংলাদেশ ও ভারতের তরুণদের আন্দোলনের মধ্যে মিল তুলে ধরে নেহা আরও বলেন, দুই দেশের তরুণদের লড়াই একই ধরনের। বাংলাদেশের ছাত্রসমাজকে ভারতের তরুণদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রশান্ত ভূষণের ‘রেজিম চেঞ্জ’ মন্তব্যনেহা বোরার বক্তব্য প্রকাশের পরদিন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, নেহা বোরা ও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অভিজিৎ দীপকে একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সরকার পরিবর্তনের প্রসঙ্গে প্রশান্ত ভূষণ বলেন, “রেজিম চেঞ্জ অবশ্যই হবে। আমরা সবাই রেজিম চেঞ্জ চাই। এতে কি কোনো ভুল আছে?”এই মন্তব্যের পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও জোরালো হয়। নেহার বক্তব্য এবং প্রশান্ত ভূষণের মন্তব্যকে একসঙ্গে তুলে ধরে বিজেপি রাহুল গান্ধী ও তাঁর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ভিন্ন মাত্রায় নেওয়ার অভিযোগ তোলে।
রাহুল গান্ধীকে নিশানা বিজেপিরবিজেপির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি দাবি করেন, নেহা বোরা ও প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্য রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার প্রতিফলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বক্তব্যের ভিডিও শেয়ার করে তিনি অভিযোগ করেন, এসব মন্তব্য ভারতে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনার প্রকাশ্য ইঙ্গিত।ভান্ডারির অভিযোগ, রাহুল গান্ধী ও তাঁর সহযোগীরা রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে চাইছেন।বিজেপির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, বাংলাদেশে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল। ভারতের ক্ষেত্রেও রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরির উদ্যোগ চলছে বলে অভিযোগ দলটির।ভান্ডারি নেহা বোরাকে রাহুল গান্ধীর ‘পোস্টার গার্ল’ বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, নেহার বক্তব্যের সঙ্গে রাহুলের রাজনৈতিক অবস্থানের মিল রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিজেপির অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।বিজেপির নতুন আইটি সেলপ্রধান দীপক মাহস্কেও নেহা ও প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, এসব মন্তব্য ভারতের রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করতে পারে। বিজেপির নেতারা ধারাবাহিকভাবে দেওয়া ‘রেজিম চেঞ্জ’ মন্তব্যগুলোকে অস্থিরতা তৈরির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন নিয়ে বিতর্ক২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে আন্দোলনটি বৃহত্তর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন এবং ভারতে আশ্রয় নেন।আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এনডিটিভির প্রতিবেদনে ওই সময়ে ইসলামপন্থী উগ্রপন্থীদের তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে বিজেপি নিজেদের অভিযোগ জোরালো করার চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ভারতের চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিস্থিতি এক নয়; দুই দেশের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।এদিকে নেহা বোরা ও রাহুল গান্ধী বিজেপির এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।