জনতার প্রেস | আন্তর্জাতিক
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার প্রতিবাদে ইউরোপের চার দেশ—ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) এসব দেশের বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান। কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতা দেখা গেছে ফ্রান্সে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেন পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।
ফ্রান্সে ব্যাপক সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ১২০০
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর শনিবার ফ্রান্সে বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে কিছু সহিংস গোষ্ঠী সরকারি ভবন, বিলাসবহুল দোকান ও সুপারমার্কেটে হামলা চালায়। পুলিশের গাড়ি ও কর্মকর্তাদের ওপরও আক্রমণ করা হয়।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানান, বিক্ষোভের ঘটনায় এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। মধ্য প্যারিসে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের দেখতে গিয়ে তিনি বলেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি না হওয়াটা বিস্ময়কর।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিস, মার্সেই, নিস, নান্ত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক ডজন দোকানে লুটপাট চালানো হয়। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার জানান, রাজধানীর বেশ কয়েকটি সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লিমোজ শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো টাউন হলের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। মার্সেই ও লিল শহরের পৌর ভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়। লিওঁ শহরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পর্যটন কার্যালয়ে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন।
বেলজিয়ামে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। শনিবারের বিক্ষোভে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা তাদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন এবং আগুন ধরিয়ে দেন। ব্রাসেলসের পূর্বাঞ্চলের শহর লিয়েজেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করা হয়। তবে এসব কর্মসূচিতে কতজন অংশ নিয়েছেন, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো সংখ্যা জানায়নি।
পর্তুগালে আবাসনসংকট ও কম মজুরি নিয়ে ক্ষোভ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে দেশটিতে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন ভাড়ার চুক্তিতেও বাড়িভাড়া প্রায় একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা লিসবনের কেন্দ্রীয় রসিও চত্বরে প্রায় ৪০টি তাঁবু স্থাপন করে অতিরিক্ত বাড়িভাড়া, আবাসনসংকট ও কম মজুরির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
শুক্রবার পর্তুগালের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম বলেন, রাস্তায় বিক্ষোভের চাপে সরকার নতি স্বীকার করবে না। তবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশটির নেতারা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।
ইতালিতে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ
ইতালির মিলান শহরের কেন্দ্রেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে দোকানপাটে লুটপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির কারণে সাধারণত ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম থাকা পিয়াজ্জা দেল দুয়োমো ও একটি বিলাসবহুল বিপণিবিতান এলাকা একপর্যায়ে জনশূন্য হয়ে পড়ে।
যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া মিছিল প্রথমে শান্তিপূর্ণ ছিল। পরে মুখোশধারী কয়েকজন বিক্ষোভকারী দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারেন। তাঁরা টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। ইতালির সংবাদ সংস্থা লাপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশসহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে এক্সে লেখেন, ‘বিক্ষোভ করা অধিকার। কিন্তু আমাদের শহরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া নয়।’
মিলানের মধ্য-বামপন্থী মেয়র জুসেপ্পে সালা বলেন, বিক্ষোভের পেছনের কারণগুলো বোধগম্য হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা ও শহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বোলোনিয়া শহরেও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়াতে পারে আন্দোলন
প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নবিষয়ক আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল-জাজিরাকে বলেন, অন্য দেশগুলোর বিক্ষোভ ফ্রান্সের মতো ব্যাপক না হলেও ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তাঁর মতে, ফ্রান্স বর্তমানে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে আরও বিক্ষোভ হতে পারে এবং নতুন নতুন এলাকায় আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে।
অধ্যাপক আলেমান্নো আরও জানান, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতেও আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে এসব দেশে বিক্ষোভের বিস্তার ঘটতে পারে।
তাঁর ব্যাখ্যায়, এসব বিক্ষোভ কোনো একক আন্দোলনের অংশ নয়। বরং বিভিন্ন দেশে পৃথকভাবে চলা আন্দোলনগুলোর পেছনে রয়েছে কিছু অভিন্ন অসন্তোষ। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা।
ইউরোপের রাজনীতিতে বাড়ছে চাপ
ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে এসব বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। আগামী ১২ মাসে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অধ্যাপক আলেমান্নোর মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যা নিয়ে চলমান বিক্ষোভ এসব দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক চাপ, আবাসনসংকট ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ সরকারগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও সরকারের ওপর জনসাধারণের চাপ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ও শিক্ষা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাড়তে থাকা অসন্তোষ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হবে এবং সরকারগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোর পরিস্থিতির ওপর।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
জনতার প্রেস | আন্তর্জাতিক
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার প্রতিবাদে ইউরোপের চার দেশ—ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) এসব দেশের বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান। কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতা দেখা গেছে ফ্রান্সে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেন পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।
ফ্রান্সে ব্যাপক সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ১২০০
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর শনিবার ফ্রান্সে বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে কিছু সহিংস গোষ্ঠী সরকারি ভবন, বিলাসবহুল দোকান ও সুপারমার্কেটে হামলা চালায়। পুলিশের গাড়ি ও কর্মকর্তাদের ওপরও আক্রমণ করা হয়।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানান, বিক্ষোভের ঘটনায় এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। মধ্য প্যারিসে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের দেখতে গিয়ে তিনি বলেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি না হওয়াটা বিস্ময়কর।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিস, মার্সেই, নিস, নান্ত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক ডজন দোকানে লুটপাট চালানো হয়। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার জানান, রাজধানীর বেশ কয়েকটি সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লিমোজ শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো টাউন হলের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। মার্সেই ও লিল শহরের পৌর ভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়। লিওঁ শহরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পর্যটন কার্যালয়ে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন।
বেলজিয়ামে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। শনিবারের বিক্ষোভে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা তাদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন এবং আগুন ধরিয়ে দেন। ব্রাসেলসের পূর্বাঞ্চলের শহর লিয়েজেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করা হয়। তবে এসব কর্মসূচিতে কতজন অংশ নিয়েছেন, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো সংখ্যা জানায়নি।
পর্তুগালে আবাসনসংকট ও কম মজুরি নিয়ে ক্ষোভ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে দেশটিতে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন ভাড়ার চুক্তিতেও বাড়িভাড়া প্রায় একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা লিসবনের কেন্দ্রীয় রসিও চত্বরে প্রায় ৪০টি তাঁবু স্থাপন করে অতিরিক্ত বাড়িভাড়া, আবাসনসংকট ও কম মজুরির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
শুক্রবার পর্তুগালের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম বলেন, রাস্তায় বিক্ষোভের চাপে সরকার নতি স্বীকার করবে না। তবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশটির নেতারা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।
ইতালিতে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ
ইতালির মিলান শহরের কেন্দ্রেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে দোকানপাটে লুটপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির কারণে সাধারণত ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম থাকা পিয়াজ্জা দেল দুয়োমো ও একটি বিলাসবহুল বিপণিবিতান এলাকা একপর্যায়ে জনশূন্য হয়ে পড়ে।
যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া মিছিল প্রথমে শান্তিপূর্ণ ছিল। পরে মুখোশধারী কয়েকজন বিক্ষোভকারী দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারেন। তাঁরা টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। ইতালির সংবাদ সংস্থা লাপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশসহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে এক্সে লেখেন, ‘বিক্ষোভ করা অধিকার। কিন্তু আমাদের শহরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া নয়।’
মিলানের মধ্য-বামপন্থী মেয়র জুসেপ্পে সালা বলেন, বিক্ষোভের পেছনের কারণগুলো বোধগম্য হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা ও শহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বোলোনিয়া শহরেও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়াতে পারে আন্দোলন
প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নবিষয়ক আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল-জাজিরাকে বলেন, অন্য দেশগুলোর বিক্ষোভ ফ্রান্সের মতো ব্যাপক না হলেও ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তাঁর মতে, ফ্রান্স বর্তমানে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে আরও বিক্ষোভ হতে পারে এবং নতুন নতুন এলাকায় আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে।
অধ্যাপক আলেমান্নো আরও জানান, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতেও আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে এসব দেশে বিক্ষোভের বিস্তার ঘটতে পারে।
তাঁর ব্যাখ্যায়, এসব বিক্ষোভ কোনো একক আন্দোলনের অংশ নয়। বরং বিভিন্ন দেশে পৃথকভাবে চলা আন্দোলনগুলোর পেছনে রয়েছে কিছু অভিন্ন অসন্তোষ। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা।
ইউরোপের রাজনীতিতে বাড়ছে চাপ
ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে এসব বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। আগামী ১২ মাসে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অধ্যাপক আলেমান্নোর মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যা নিয়ে চলমান বিক্ষোভ এসব দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক চাপ, আবাসনসংকট ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ সরকারগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও সরকারের ওপর জনসাধারণের চাপ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ও শিক্ষা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাড়তে থাকা অসন্তোষ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হবে এবং সরকারগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোর পরিস্থিতির ওপর।

আপনার মতামত লিখুন