জনতার প্রেস

মূল পাতা

সারাদেশ

লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে ফকির-সাধুদের মিলনমেলা। বাউলগান, তত্ত্ব আলোচনা ও সাধন-ভজনে কাটছে সময়; আজ সোমবার শেষ হচ্ছে তিন দিনের আয়োজন।

লালনের আখড়ায় সাধুসঙ্গ, গানে-সাধনায় মুখর ছেঁউড়িয়া

লালনের আখড়ায় সাধুসঙ্গ, গানে-সাধনায় মুখর ছেঁউড়িয়া
গান গাইছেন ফকির সাধু ভক্তরা। আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় কুষ্টিয়ায় ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহর আখড়াবাড়িতেছবি:

হেমন্তের সকালের মিষ্টি রোদ। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়ির প্রাঙ্গণে সাদা শাড়ি পরে বসে আছেন সুরাইয়া মরিয়ম। দুই হাতে মন্দিরা বাজিয়ে সুর তুলেছেন—‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’। পাশে বসা আরেকজন বাজাচ্ছেন ছোট্ট একতারা। গানের সুরে, ভাবের আবেশে আর মরমি সাধনায় মুখর হয়ে উঠেছে আখড়াবাড়ির পরিবেশ।

সুরাইয়ার বাড়ি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার বালিয়া গ্রামে। বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লালনের আখড়ায় এসেছেন তিনি। নিজের অনুভূতি জানিয়ে সুরাইয়া বলেন, ‘সাঁইজির কথা ভালো লাগে। এবার কবুল হয়েছে, তাই আসতে পারছি। আনন্দ লাগছে, জানডা শীতল হয়ে গেছে।’

রোববার লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে এভাবেই ছোট ছোট আসরে সাঁইজি লালন শাহকে স্মরণ করছিলেন ফকির-সাধুরা। গানের সুর, একতারার ঝংকার আর মরমি ভাবধারার আলোচনায় দিনভর মুখর ছিল১৩৬তম তিরোধান দিবস আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ।

সুরাইয়ার গানের আসরে হঠাৎ হাজির হন সাদা চুল-দাড়ির এক বয়োজ্যেষ্ঠ ফকির। হাতে বিশাল পাখা নিয়ে তিনি উপস্থিত সবার মাথার ওপর বাতাস করতে থাকেন। তাঁর ভাষায়, এটি ভক্তি নিবেদনের অংশ। এতে সবাই মনপ্রাণ খুলে গান গাইতে পারেন।

সাধুসঙ্গের আচার, গানে-গানে লালনস্মরণ

খুব সকালে গোষ্ঠগানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ফকিরদের আচার-অনুষ্ঠান। সকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাল্যসেবা’। এ পর্বে কয়েকজন বাউল ‘ভেক গ্রহণ’ করেন। এরপর পায়েস-মুড়ি খেয়ে শুরু হয় গানবাজনা ও তত্ত্ব আলোচনা। সাধুসঙ্গের নিজস্ব রীতি মেনে চলতে থাকে আধ্যাত্মিক চর্চা।

দুপুরে নারী-পুরুষের অনেকেই কালী নদীর রাজঘাটে গোসল সেরে নেন। এরপর অনুষ্ঠিত হয় ‘পূর্ণ সেবা’। খাবারের তালিকায় ছিল সাদা ভাত, ইলিশ মাছ, কলাইয়ের ডাল, সবজি ও দই। বিকেলে শেষ হয় ২৪ ঘণ্টার সাধুসঙ্গ। তবে আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হলেও থেমে থাকেনি বাউলগান, বাদ্যযন্ত্রের সুর ও মরমি আলোচনা।

আখড়াবাড়ি ঘুরে দেখা যায়, কেউ আপনমনে বাঁশি বাজাচ্ছেন, কেউ আঁকছেন লালন শাহের ছবি। কেউ দোতারা, একতারা, মন্দিরা ও ডুগি বাজিয়ে গানের আসর জমিয়ে তুলছেন। বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে আখড়াবাড়ির পরিবেশে তৈরি হয়েছে সাধনা, সংগীত ও আত্মিক সংযোগের আবহ।

তবে আয়োজকদের এবারের সমাগম গত বছরের তিরোধান দিবসের আয়োজনের তুলনায় কিছুটা কম বলে দেখা গেছে।

সাত দশকের স্মৃতিতে বদলে যাওয়া আখড়াবাড়ি

রাজবাড়ীর কালুখালীর আবদুল শাহ ফকির প্রায় ৭০ বছর ধরে আখড়াবাড়িতে আসছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী আমেনা খাতুন। দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে আবদুল শাহ ফকির জানান, আগে আখড়াবাড়ির ধামে ছিল গাছগাছালি, ছিল ছোট দুটি খড়ের ঘর। তখন চার-পাঁচটি আসর বসত। এখন এখানে মানুষের ভিড় অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে নানা ধরনের মানুষ আসেন লালনের টানে।

আখড়াবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নাটোর থেকে আসা নূর মোহাম্মদ। তাঁর কাছে লালন কেবল গান কিংবা কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; লালনের দর্শন উপলব্ধি করতে হলে তা নিজের অন্তরে ধারণ করতে হয়।

নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘মনের টানে আসা। লালনের কথা জানলে বা শুনলে হবে না, অন্তরে ধারণ করতে হবে। চর্চা করতে হবে, সাধন-ভজন করতে হয়। কেউ যদি তাঁর কথা অনুসরণ করেন, তাঁর জীবন ধন্য হবে।’

বিদায়ের সময়ও থেকে যায় সাধুসঙ্গের টান

বিকেলের পর কয়েকজন ফকির-সাধুকে আখড়াবাড়ি ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে দেখা যায়। তবে বিদায়ের মুহূর্তেও তাঁদের কণ্ঠে ছিল সাধুসঙ্গের প্রতি গভীর টান। আত্মার মিলনমেলা শেষ করে নিজের ডেরায় ফিরতে হলেও মনের তৃষ্ণা যেন কিছুতেই মেটে না। চলে যেতে চাইলেও মন পড়ে থাকে লালনের আখড়ায়।

আলোচনা ও সংগীতে শেষ হচ্ছে তিন দিনের আয়োজন

লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী রাতে মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী বিউটিসহ লালন একাডেমির শিল্পীরা।

জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন। লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সোমবার সন্ধ্যায় আলোচনা সভা এবং রাতে মঞ্চে সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের তিন দিনের আয়োজন।

লালনের গান, দর্শন ও মানবতাবাদী ভাবধারাকে ধারণ করে ছেঁউড়িয়ার এই সাধুসঙ্গ আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—লালনকে খুঁজে পাওয়ার পথ কেবল গানে নয়, মানুষের অন্তরের উপলব্ধি, সাধনা ও মানবিকতার মধ্যেও।

লালন শাহ, লালন তিরোধান ১৩৬তম তিরোধান দিবস কুষ্টিয়া, সাধুসঙ্গ,

আপনার মতামত লিখুন

লালনের আখড়ায় সাধুসঙ্গ, গানে-সাধনায় মুখর ছেঁউড়িয়া
0:00 0:00
1.0x
জনতার প্রেস

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


লালনের আখড়ায় সাধুসঙ্গ, গানে-সাধনায় মুখর ছেঁউড়িয়া

প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

হেমন্তের সকালের মিষ্টি রোদ। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়ির প্রাঙ্গণে সাদা শাড়ি পরে বসে আছেন সুরাইয়া মরিয়ম। দুই হাতে মন্দিরা বাজিয়ে সুর তুলেছেন—‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’। পাশে বসা আরেকজন বাজাচ্ছেন ছোট্ট একতারা। গানের সুরে, ভাবের আবেশে আর মরমি সাধনায় মুখর হয়ে উঠেছে আখড়াবাড়ির পরিবেশ।

সুরাইয়ার বাড়ি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার বালিয়া গ্রামে। বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লালনের আখড়ায় এসেছেন তিনি। নিজের অনুভূতি জানিয়ে সুরাইয়া বলেন, ‘সাঁইজির কথা ভালো লাগে। এবার কবুল হয়েছে, তাই আসতে পারছি। আনন্দ লাগছে, জানডা শীতল হয়ে গেছে।’

রোববার লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে এভাবেই ছোট ছোট আসরে সাঁইজি লালন শাহকে স্মরণ করছিলেন ফকির-সাধুরা। গানের সুর, একতারার ঝংকার আর মরমি ভাবধারার আলোচনায় দিনভর মুখর ছিল১৩৬তম তিরোধান দিবস আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ।

সুরাইয়ার গানের আসরে হঠাৎ হাজির হন সাদা চুল-দাড়ির এক বয়োজ্যেষ্ঠ ফকির। হাতে বিশাল পাখা নিয়ে তিনি উপস্থিত সবার মাথার ওপর বাতাস করতে থাকেন। তাঁর ভাষায়, এটি ভক্তি নিবেদনের অংশ। এতে সবাই মনপ্রাণ খুলে গান গাইতে পারেন।

সাধুসঙ্গের আচার, গানে-গানে লালনস্মরণ

খুব সকালে গোষ্ঠগানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ফকিরদের আচার-অনুষ্ঠান। সকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাল্যসেবা’। এ পর্বে কয়েকজন বাউল ‘ভেক গ্রহণ’ করেন। এরপর পায়েস-মুড়ি খেয়ে শুরু হয় গানবাজনা ও তত্ত্ব আলোচনা। সাধুসঙ্গের নিজস্ব রীতি মেনে চলতে থাকে আধ্যাত্মিক চর্চা।

দুপুরে নারী-পুরুষের অনেকেই কালী নদীর রাজঘাটে গোসল সেরে নেন। এরপর অনুষ্ঠিত হয় ‘পূর্ণ সেবা’। খাবারের তালিকায় ছিল সাদা ভাত, ইলিশ মাছ, কলাইয়ের ডাল, সবজি ও দই। বিকেলে শেষ হয় ২৪ ঘণ্টার সাধুসঙ্গ। তবে আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হলেও থেমে থাকেনি বাউলগান, বাদ্যযন্ত্রের সুর ও মরমি আলোচনা।

আখড়াবাড়ি ঘুরে দেখা যায়, কেউ আপনমনে বাঁশি বাজাচ্ছেন, কেউ আঁকছেন লালন শাহের ছবি। কেউ দোতারা, একতারা, মন্দিরা ও ডুগি বাজিয়ে গানের আসর জমিয়ে তুলছেন। বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে আখড়াবাড়ির পরিবেশে তৈরি হয়েছে সাধনা, সংগীত ও আত্মিক সংযোগের আবহ।

তবে আয়োজকদের এবারের সমাগম গত বছরের তিরোধান দিবসের আয়োজনের তুলনায় কিছুটা কম বলে দেখা গেছে।

সাত দশকের স্মৃতিতে বদলে যাওয়া আখড়াবাড়ি

রাজবাড়ীর কালুখালীর আবদুল শাহ ফকির প্রায় ৭০ বছর ধরে আখড়াবাড়িতে আসছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী আমেনা খাতুন। দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে আবদুল শাহ ফকির জানান, আগে আখড়াবাড়ির ধামে ছিল গাছগাছালি, ছিল ছোট দুটি খড়ের ঘর। তখন চার-পাঁচটি আসর বসত। এখন এখানে মানুষের ভিড় অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে নানা ধরনের মানুষ আসেন লালনের টানে।

আখড়াবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নাটোর থেকে আসা নূর মোহাম্মদ। তাঁর কাছে লালন কেবল গান কিংবা কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; লালনের দর্শন উপলব্ধি করতে হলে তা নিজের অন্তরে ধারণ করতে হয়।

নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘মনের টানে আসা। লালনের কথা জানলে বা শুনলে হবে না, অন্তরে ধারণ করতে হবে। চর্চা করতে হবে, সাধন-ভজন করতে হয়। কেউ যদি তাঁর কথা অনুসরণ করেন, তাঁর জীবন ধন্য হবে।’

বিদায়ের সময়ও থেকে যায় সাধুসঙ্গের টান

বিকেলের পর কয়েকজন ফকির-সাধুকে আখড়াবাড়ি ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে দেখা যায়। তবে বিদায়ের মুহূর্তেও তাঁদের কণ্ঠে ছিল সাধুসঙ্গের প্রতি গভীর টান। আত্মার মিলনমেলা শেষ করে নিজের ডেরায় ফিরতে হলেও মনের তৃষ্ণা যেন কিছুতেই মেটে না। চলে যেতে চাইলেও মন পড়ে থাকে লালনের আখড়ায়।

আলোচনা ও সংগীতে শেষ হচ্ছে তিন দিনের আয়োজন

লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী রাতে মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী বিউটিসহ লালন একাডেমির শিল্পীরা।

জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন। লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সোমবার সন্ধ্যায় আলোচনা সভা এবং রাতে মঞ্চে সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের তিন দিনের আয়োজন।

লালনের গান, দর্শন ও মানবতাবাদী ভাবধারাকে ধারণ করে ছেঁউড়িয়ার এই সাধুসঙ্গ আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—লালনকে খুঁজে পাওয়ার পথ কেবল গানে নয়, মানুষের অন্তরের উপলব্ধি, সাধনা ও মানবিকতার মধ্যেও।


জনতার প্রেস

সম্পাদক ও প্রকাশক
মোঃ আরেফিন ইসলাম 
নির্বাহী সম্পাদক
আবুল কালাম আজাদ
বার্তা সম্পাদক
মুক্তা আক্তার

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত জনতার প্রেস