একসময় সমাজের চোখে তারা ছিল ‘অভিশপ্ত’। জন্মের পর থেকেই কুসংস্কার, অপবাদ আর মানুষের অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল মনি-মুক্তাকে। কেউ কেউ তাদের জন্মকে অমঙ্গল হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অন্ধকার পেছনে ফেলে দুই বোন এখন হয়ে উঠেছে সাহস, স্বপ্ন ও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল উদাহরণ।
শনিবার (২২ আগস্ট) ১৮ বছরে পা দিয়েছে দিনাজপুরের বীরগঞ্জের মনি-মুক্তা। জন্মদিনে দেশবাসীর কাছে দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছে তারা। তাদের স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া এবং সমাজের অসহায় ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
মনি-মুক্তা বলেন, ‘পড়াশোনা শেষে মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজের অসহায় ও অবহেলিতদের সেবা করতে চাই। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। দেশবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা পেলে অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।’
তারা জানায়, প্রতি বছর আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, পাড়া-প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জন্মদিন পালন করলেও এবার ঘরোয়াভাবে দিনটি উদযাপন করবে তারা।
জোড়া শরীর থেকে আলাদা জীবন
২০০৯ সালের ২২ আগস্ট দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ল্যাম্ব হাসপাতালে জন্ম নেয় মনি ও মুক্তা। জন্মের পর চিকিৎসক ও স্বজনদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি হয়। কারণ, তারা ছিল পেট জোড়া লাগানো যমজ শিশু।
তাদের জন্মের পর নানা কুসংস্কার ও অপবাদের শিকার হতে হয় পরিবারকে। কেউ কেউ এটিকে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ হিসেবে দেখিয়ে পরিবারের প্রতি কটু মন্তব্যও করতেন। তবে বাবা জয় প্রকাশ পাল ও মা কৃষ্ণা রাণী পাল এসব প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসকদের পরামর্শে ঢাকার শিশু হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এআর খানের নেতৃত্বে মনি-মুক্তার জটিল অস্ত্রোপচার হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ওই অস্ত্রোপচারের পর সফলভাবে দুই বোনকে আলাদা করা সম্ভব হয়। ঘটনাটি দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রেও আলোচিত হয়ে ওঠে।
পড়াশোনায় সাফল্য, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও প্রতিভা
বর্তমানে মনি-মুক্তা দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার শতগ্রাম ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামে বসবাস করছে। দুজনেই স্থানীয় ঝাড়বাড়ী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।
শুধু পড়াশোনাতেই নয়, নাচ, গান, ছবি আঁকা ও কাপড়ে পেইন্টিংয়েও রয়েছে তাদের দক্ষতা। স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাদের প্রতিভার প্রশংসা করেন এলাকাবাসী।
মনি-মুক্তার ভাই জয় প্রকাশ পাল বলেন, ‘মনি-মুক্তা পড়াশোনায় মনোযোগী। পাশাপাশি নাচ, গান ও আঁকাআঁকিতে তাদের প্রতিভা গ্রামের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। আমি দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, তারা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশের সেবা করতে পারে।’
‘একসময় একঘরে করা হয়েছিল’
মা কৃষ্ণা রাণী পাল বলেন, ‘জন্মের পর সমাজের নানা কুসংস্কারের কারণে আমাদের একঘরে করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভগবান ও চিকিৎসকদের আশীর্বাদে আজ তারা স্বাভাবিকভাবে বেঁচে আছে। আমরা চাই, তারা বড় হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াক।’
তিনি আরও বলেন, একসময় যাদের সমাজের কেউ কেউ ‘অভিশপ্ত’ বলেছিল, আজ তারাই গ্রামের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। শিক্ষা, পারিবারিক সাহস ও সামাজিক সহযোগিতা থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না—মনি-মুক্তা সেটিই প্রমাণ করেছে।
মনি-মুক্তার স্বপ্নও এখন স্পষ্ট—শিক্ষাজীবন শেষ করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের অসহায় ও অবহেলিত মানুষের সেবা করা।
তাদের জীবনগল্প তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায়, পারিবারিক ভালোবাসা ও মানবিকতার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। জন্মের পর যে দুই শিশুকে কুসংস্কারের চোখে দেখা হয়েছিল, ১৮ বছরে তারাই হয়ে উঠেছে একটি গ্রামের মানুষের গর্ব ও অনুপ্রেরণার নাম।

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
একসময় সমাজের চোখে তারা ছিল ‘অভিশপ্ত’। জন্মের পর থেকেই কুসংস্কার, অপবাদ আর মানুষের অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল মনি-মুক্তাকে। কেউ কেউ তাদের জন্মকে অমঙ্গল হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অন্ধকার পেছনে ফেলে দুই বোন এখন হয়ে উঠেছে সাহস, স্বপ্ন ও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল উদাহরণ।
শনিবার (২২ আগস্ট) ১৮ বছরে পা দিয়েছে দিনাজপুরের বীরগঞ্জের মনি-মুক্তা। জন্মদিনে দেশবাসীর কাছে দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছে তারা। তাদের স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া এবং সমাজের অসহায় ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
মনি-মুক্তা বলেন, ‘পড়াশোনা শেষে মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজের অসহায় ও অবহেলিতদের সেবা করতে চাই। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। দেশবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা পেলে অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।’
তারা জানায়, প্রতি বছর আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, পাড়া-প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জন্মদিন পালন করলেও এবার ঘরোয়াভাবে দিনটি উদযাপন করবে তারা।
জোড়া শরীর থেকে আলাদা জীবন
২০০৯ সালের ২২ আগস্ট দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ল্যাম্ব হাসপাতালে জন্ম নেয় মনি ও মুক্তা। জন্মের পর চিকিৎসক ও স্বজনদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি হয়। কারণ, তারা ছিল পেট জোড়া লাগানো যমজ শিশু।
তাদের জন্মের পর নানা কুসংস্কার ও অপবাদের শিকার হতে হয় পরিবারকে। কেউ কেউ এটিকে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ হিসেবে দেখিয়ে পরিবারের প্রতি কটু মন্তব্যও করতেন। তবে বাবা জয় প্রকাশ পাল ও মা কৃষ্ণা রাণী পাল এসব প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসকদের পরামর্শে ঢাকার শিশু হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এআর খানের নেতৃত্বে মনি-মুক্তার জটিল অস্ত্রোপচার হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ওই অস্ত্রোপচারের পর সফলভাবে দুই বোনকে আলাদা করা সম্ভব হয়। ঘটনাটি দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রেও আলোচিত হয়ে ওঠে।
পড়াশোনায় সাফল্য, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও প্রতিভা
বর্তমানে মনি-মুক্তা দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার শতগ্রাম ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামে বসবাস করছে। দুজনেই স্থানীয় ঝাড়বাড়ী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।
শুধু পড়াশোনাতেই নয়, নাচ, গান, ছবি আঁকা ও কাপড়ে পেইন্টিংয়েও রয়েছে তাদের দক্ষতা। স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাদের প্রতিভার প্রশংসা করেন এলাকাবাসী।
মনি-মুক্তার ভাই জয় প্রকাশ পাল বলেন, ‘মনি-মুক্তা পড়াশোনায় মনোযোগী। পাশাপাশি নাচ, গান ও আঁকাআঁকিতে তাদের প্রতিভা গ্রামের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। আমি দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, তারা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশের সেবা করতে পারে।’
‘একসময় একঘরে করা হয়েছিল’
মা কৃষ্ণা রাণী পাল বলেন, ‘জন্মের পর সমাজের নানা কুসংস্কারের কারণে আমাদের একঘরে করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভগবান ও চিকিৎসকদের আশীর্বাদে আজ তারা স্বাভাবিকভাবে বেঁচে আছে। আমরা চাই, তারা বড় হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াক।’
তিনি আরও বলেন, একসময় যাদের সমাজের কেউ কেউ ‘অভিশপ্ত’ বলেছিল, আজ তারাই গ্রামের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। শিক্ষা, পারিবারিক সাহস ও সামাজিক সহযোগিতা থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না—মনি-মুক্তা সেটিই প্রমাণ করেছে।
মনি-মুক্তার স্বপ্নও এখন স্পষ্ট—শিক্ষাজীবন শেষ করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের অসহায় ও অবহেলিত মানুষের সেবা করা।
তাদের জীবনগল্প তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায়, পারিবারিক ভালোবাসা ও মানবিকতার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। জন্মের পর যে দুই শিশুকে কুসংস্কারের চোখে দেখা হয়েছিল, ১৮ বছরে তারাই হয়ে উঠেছে একটি গ্রামের মানুষের গর্ব ও অনুপ্রেরণার নাম।

আপনার মতামত লিখুন