জনতার প্রেস

মূল পাতা

সারাদেশ

জয়ন্তীর ওপর হামলার ছবি

জয়ন্তীর ওপর হামলার ছবি
জয়ন্তীর ওপর হামলার ছবি |জনতার প্রেস

৪ আগস্ট ২০২৪। সকাল গড়াতেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ গোলচত্বরে সরকার পতনের একদফা দাবিতে অবস্থান নিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্র-জনতা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি রূপ নেয় রক্তাক্ত সংঘর্ষে।

সেই দিনের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি ছবি আজও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। লাল পোশাক পরা এক তরুণী দুই হাত তুলে নিজের মাথা রক্ষার চেষ্টা করছেন। চারপাশে হামলাকারীদের আঘাত, আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খলা। সেই তরুণীই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক জয়ন্তী বিশ্বাস। ছবিটি কেবল একজন নারীর ওপর হামলার দৃশ্য নয়; এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জুলাই আন্দোলনের সাহস, প্রতিরোধ ও ত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

জয়ন্তী বিশ্বাস জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৬ জুলাই থেকেই। তিনি বলেন, ‘মূলত ১৬ জুলাই থেকেই আমরা স্থানীয় সরকারি ফিরোজ মিয়া কলেজ থেকে ঢাকায় ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলন শুরু করি। এটিই ছিল জেলার প্রথম কর্মসূচি। ওইদিন ঢাকায় অসংখ্য ছাত্র-জনতা নিহত হওয়ার পাশাপাশি রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নির্মমভাবে শহীদ হন। প্রতিবাদে সারাদেশে কর্মসূচি ঘোষণা হলে আমরা আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করি।’

তিনি জানান, ওইদিন আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাবের তৎকালীন নেতারা আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ান। বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতার উপস্থিতির কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সঙ্ঘাতে যায়নি। প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধ চলার পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বাধা দেয়া হবে না বলে আশ্বাস দিলে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। রাতে আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাবে বৈঠক হয়। সিদ্ধান্ত হয়, আন্দোলন চলবে। সেই রাতেই ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ডসহ আন্দোলনের সব সরঞ্জাম প্রেস ক্লাবে জমা রাখা হয়।

পরদিন দুপুরে ছাত্র-জনতা প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হতে থাকলে পুলিশ বাধা দেয়। জয়ন্তী বিশ্বাস বলেন, ‘একপর্যায়ে প্রেস ক্লাব চত্বরে ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত হামলা হয়। তৎকালীন আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রেস ক্লাবের ভেতরেই ছাত্র সমন্বয়ক রোহান মাহমুদকে বেধড়ক মারধর করেন। তিনি নিজেও একজন সাংবাদিক এবং প্রেস ক্লাবের সহযোগী সদস্য ছিলেন। এমনকি প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও ক্লাবে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়।’

তিনি জানান, পরে ছাত্র-জনতা মহাসড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ গুলি চালায়। এরপর আন্দোলনকারীরা আশুগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। একই দিন সন্ধ্যায় সোহাগপুর আব্বাসউদ্দীন খান কলেজের সামনেও ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি ছোড়া হয়। দুই স্থানেই অনেকে আহত হন। ১৭ জুলাই কেন্দ্রীয়ভাবে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণার পর আন্দোলন সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘এরপর আমরা প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মসূচি পালন করেছি। জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উপজেলায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরে সরকার পতনের একদফা ঘোষণার পর আন্দোলন আরো বেগবান হয়।’

আন্দোলনের শুরু থেকেই আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাব ছিল আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কেন্দ্র। এ কারণে ক্লাবের দায়িত্বশীলদেরও নানা ধরনের চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়। তৎকালীন আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক নয়া দিগন্তের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আন্দোলনে পৃষ্ঠপোষকতা করার কারণে প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা আমাকে এবং প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম সাচ্চুকে হুমকি দিত। পুলিশের জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও গ্রেফতারের ভয় দেখাতেন। এতো চাপ ও হুমকির মুখেও আমরা ছাত্র-জনতার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।’

অন্যদিকে জয়ন্তী বিশ্বাসও জানান, আন্দোলনের শুরু থেকেই তাকে ভয়ভীতি ও চাপের মুখে রাখা হয়েছিল। তার ভাষায়, ‘স্থানীয় এমপিসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা আমাকে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বারবার হুমকি দিতেন। কিন্তু আমরা মনে করেছি, এটি শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকারের আন্দোলন। তাই ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে মাঠে ছিলাম।’

৪ আগস্ট সকালে আন্দোলনকারীরা আশুগঞ্জ গোলচত্বরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান নেন। জয়ন্তী বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায়। আমি এবং আবু সুফিয়ান আজাদ গুরুতর আহত হই। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা আমাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। তখন পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার এক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার মানুষ গোলচত্বরে জড়ো হন। হামলাকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতা আওয়ামী লীগের এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানকে মারধর করেন। পরে থানা ঘেরাওয়ের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিপুল পরিমাণ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধ হন। দীর্ঘ সময় বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যান চলাচল।

তবে ৪ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনা শুধু আশুগঞ্জেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। সদর উপজেলার বিরাসারে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সরাইলের কুট্টাপাড়া ও বিশ্বরোড মোড়েও ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং পুলিশের টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টা ধরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল বন্ধ ছিল।

৪ আগস্টের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বড়তল্লা গ্রামের দর্জি শাহ আলম। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে গুলি অপসারণ করা গেলেও মাথায় থাকা গুলিটি আর বের করা সম্ভব হয়নি। উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ পেলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হয়নি। প্রায় দেড় বছর মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। রেখে যান এক ছেলে ও দুই মেয়েকে। শাহ আলমের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়, ৪ আগস্টের গুলি শুধু সেদিনের রাস্তায় মানুষকে রক্তাক্ত করেনি; তার ক্ষত বহুদিন ধরে বহন করেছে অনেক পরিবার।

ইতিহাসের অনেক ঘটনা হাজারো শব্দে লেখা হয়। আবার কিছু ইতিহাস একটি ছবিতেই ধরা পড়ে। আশুগঞ্জ গোলচত্বরে জয়ন্তী বিশ্বাসের দুই হাত তুলে আঘাত প্রতিহত করার সেই মুহূর্তও তেমনই একটি ছবি। এটি শুধু একজন নারী আন্দোলনকারীর আত্মরক্ষার দৃশ্য নয়; এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জুলাই আন্দোলনে ভয়কে অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে থাকার প্রতীক। বছর পেরিয়ে গেলেও ছবিটি মনে করিয়ে দেয়—জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস শুধু মিছিল, স্লোগান কিংবা সংঘর্ষের নয়; এটি সাহস, ত্যাগ, প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির ইতিহাসও।

৪ আগস্টের ওই হামলার ঘটনায় পরে জয়ন্তী ও ছাত্র সমন্বয়ক রোহান মাহমুদ পৃথক দু’টি মামলা করেন। মামলাগুলোতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান

আপনার মতামত লিখুন

জয়ন্তীর ওপর হামলার ছবি
0:00 0:00
1.0x
জনতার প্রেস

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


জয়ন্তীর ওপর হামলার ছবি

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

৪ আগস্ট ২০২৪। সকাল গড়াতেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ গোলচত্বরে সরকার পতনের একদফা দাবিতে অবস্থান নিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্র-জনতা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি রূপ নেয় রক্তাক্ত সংঘর্ষে।

সেই দিনের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি ছবি আজও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। লাল পোশাক পরা এক তরুণী দুই হাত তুলে নিজের মাথা রক্ষার চেষ্টা করছেন। চারপাশে হামলাকারীদের আঘাত, আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খলা। সেই তরুণীই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক জয়ন্তী বিশ্বাস। ছবিটি কেবল একজন নারীর ওপর হামলার দৃশ্য নয়; এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জুলাই আন্দোলনের সাহস, প্রতিরোধ ও ত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

জয়ন্তী বিশ্বাস জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৬ জুলাই থেকেই। তিনি বলেন, ‘মূলত ১৬ জুলাই থেকেই আমরা স্থানীয় সরকারি ফিরোজ মিয়া কলেজ থেকে ঢাকায় ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলন শুরু করি। এটিই ছিল জেলার প্রথম কর্মসূচি। ওইদিন ঢাকায় অসংখ্য ছাত্র-জনতা নিহত হওয়ার পাশাপাশি রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নির্মমভাবে শহীদ হন। প্রতিবাদে সারাদেশে কর্মসূচি ঘোষণা হলে আমরা আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করি।’

তিনি জানান, ওইদিন আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাবের তৎকালীন নেতারা আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ান। বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতার উপস্থিতির কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সঙ্ঘাতে যায়নি। প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধ চলার পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বাধা দেয়া হবে না বলে আশ্বাস দিলে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। রাতে আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাবে বৈঠক হয়। সিদ্ধান্ত হয়, আন্দোলন চলবে। সেই রাতেই ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ডসহ আন্দোলনের সব সরঞ্জাম প্রেস ক্লাবে জমা রাখা হয়।

পরদিন দুপুরে ছাত্র-জনতা প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হতে থাকলে পুলিশ বাধা দেয়। জয়ন্তী বিশ্বাস বলেন, ‘একপর্যায়ে প্রেস ক্লাব চত্বরে ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত হামলা হয়। তৎকালীন আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রেস ক্লাবের ভেতরেই ছাত্র সমন্বয়ক রোহান মাহমুদকে বেধড়ক মারধর করেন। তিনি নিজেও একজন সাংবাদিক এবং প্রেস ক্লাবের সহযোগী সদস্য ছিলেন। এমনকি প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও ক্লাবে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়।’

তিনি জানান, পরে ছাত্র-জনতা মহাসড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ গুলি চালায়। এরপর আন্দোলনকারীরা আশুগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। একই দিন সন্ধ্যায় সোহাগপুর আব্বাসউদ্দীন খান কলেজের সামনেও ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি ছোড়া হয়। দুই স্থানেই অনেকে আহত হন। ১৭ জুলাই কেন্দ্রীয়ভাবে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণার পর আন্দোলন সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘এরপর আমরা প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মসূচি পালন করেছি। জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উপজেলায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরে সরকার পতনের একদফা ঘোষণার পর আন্দোলন আরো বেগবান হয়।’

আন্দোলনের শুরু থেকেই আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাব ছিল আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কেন্দ্র। এ কারণে ক্লাবের দায়িত্বশীলদেরও নানা ধরনের চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়। তৎকালীন আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক নয়া দিগন্তের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আন্দোলনে পৃষ্ঠপোষকতা করার কারণে প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা আমাকে এবং প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম সাচ্চুকে হুমকি দিত। পুলিশের জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও গ্রেফতারের ভয় দেখাতেন। এতো চাপ ও হুমকির মুখেও আমরা ছাত্র-জনতার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।’

অন্যদিকে জয়ন্তী বিশ্বাসও জানান, আন্দোলনের শুরু থেকেই তাকে ভয়ভীতি ও চাপের মুখে রাখা হয়েছিল। তার ভাষায়, ‘স্থানীয় এমপিসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা আমাকে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বারবার হুমকি দিতেন। কিন্তু আমরা মনে করেছি, এটি শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকারের আন্দোলন। তাই ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে মাঠে ছিলাম।’

৪ আগস্ট সকালে আন্দোলনকারীরা আশুগঞ্জ গোলচত্বরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান নেন। জয়ন্তী বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায়। আমি এবং আবু সুফিয়ান আজাদ গুরুতর আহত হই। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা আমাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। তখন পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার এক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার মানুষ গোলচত্বরে জড়ো হন। হামলাকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতা আওয়ামী লীগের এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানকে মারধর করেন। পরে থানা ঘেরাওয়ের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিপুল পরিমাণ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধ হন। দীর্ঘ সময় বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যান চলাচল।

তবে ৪ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনা শুধু আশুগঞ্জেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। সদর উপজেলার বিরাসারে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সরাইলের কুট্টাপাড়া ও বিশ্বরোড মোড়েও ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং পুলিশের টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টা ধরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল বন্ধ ছিল।

৪ আগস্টের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বড়তল্লা গ্রামের দর্জি শাহ আলম। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে গুলি অপসারণ করা গেলেও মাথায় থাকা গুলিটি আর বের করা সম্ভব হয়নি। উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ পেলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হয়নি। প্রায় দেড় বছর মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। রেখে যান এক ছেলে ও দুই মেয়েকে। শাহ আলমের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়, ৪ আগস্টের গুলি শুধু সেদিনের রাস্তায় মানুষকে রক্তাক্ত করেনি; তার ক্ষত বহুদিন ধরে বহন করেছে অনেক পরিবার।

ইতিহাসের অনেক ঘটনা হাজারো শব্দে লেখা হয়। আবার কিছু ইতিহাস একটি ছবিতেই ধরা পড়ে। আশুগঞ্জ গোলচত্বরে জয়ন্তী বিশ্বাসের দুই হাত তুলে আঘাত প্রতিহত করার সেই মুহূর্তও তেমনই একটি ছবি। এটি শুধু একজন নারী আন্দোলনকারীর আত্মরক্ষার দৃশ্য নয়; এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জুলাই আন্দোলনে ভয়কে অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে থাকার প্রতীক। বছর পেরিয়ে গেলেও ছবিটি মনে করিয়ে দেয়—জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস শুধু মিছিল, স্লোগান কিংবা সংঘর্ষের নয়; এটি সাহস, ত্যাগ, প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির ইতিহাসও।

৪ আগস্টের ওই হামলার ঘটনায় পরে জয়ন্তী ও ছাত্র সমন্বয়ক রোহান মাহমুদ পৃথক দু’টি মামলা করেন। মামলাগুলোতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান।


জনতার প্রেস

সম্পাদক ও প্রকাশক
মোঃ আরেফিন ইসলাম 
নির্বাহী সম্পাদক
আবুল কালাম আজাদ
বার্তা সম্পাদক
মুক্তা আক্তার

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত জনতার প্রেস