জনতার প্রেস

মূল পাতা

মতামত

হরমুজ প্রণালী কার নিয়ন্ত্রণে: সেন্টকম ও ইরানের নতুন স্নায়ুযুদ্ধ।

হরমুজ প্রণালী কার নিয়ন্ত্রণে: সেন্টকম ও ইরানের নতুন স্নায়ুযুদ্ধ।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক বিবৃতিতে সরাসরি দাবি করেছে—"ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে না।" যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য মূলত তেহরানের সেই প্রচ্ছন্ন হুমকির পাল্টা জবাব, যেখানে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছিল যে প্রয়োজনে তারা এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের জাহাজ চলাচল পুরোপুরি ব্যাহত করতে পারে।

​মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ৮০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি (৩৮০ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালী দিয়ে নিরাপদে পার হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তার পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ।

​মার্কিন বিবৃতির নেপথ্য কৌশল: তিনটি মূল লক্ষ্য

​সেন্টকমের এই অনমনীয় অবস্থানের পেছনে প্রধানত তিনটি ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে:

  • বিশ্ববাজারকে আশ্বস্ত করা: হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। এখানে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলকে বার্তা দিতে চাইছে যে, সমুদ্রপথটি সম্পূর্ণ সচল ও নিরাপদ রয়েছে।
  • সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতা প্রমাণ: ৮০০ জাহাজ ও ৩৮ কোটি ব্যারেল তেল নিরাপদে পারাপারের খতিয়ান দিয়ে পেন্টাগন বিশ্বকে দেখাতে চাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে বা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি কতটা জরুরি।
  • তথ্যযুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক চাপ: এটি কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও বটে। ওয়াশিংটন বৈশ্বিক স্তরে এটি প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যে, আন্তর্জাতিক এই নৌপথের ওপর কোনো একক দেশের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে যেন বিশ্ববাসী অতিরঞ্জিত করে না দেখে।

​ইরানের পাল্টা যুক্তি: ভৌগোলিক অবস্থান ও সার্বভৌমত্বের লড়াই

​মার্কিন প্রশাসনের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। ইরানের সরকারি অবস্থান এবং সাম্প্রতিক বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের এই ন্যারেটিভের একদম বিপরীত। তেহরানের যুক্তিগুলোও বেশ জোরালো:

  • অস্বীকার করার উপায় নেই ভৌগোলিক বাস্তবতা: হরমুজ প্রণালীর উত্তর উপকূলের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ইরান। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই এই জলপথের নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের এক ধরনের বাস্তব ও আইনি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ইরানের দাবি—উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোরই, বাইরের কোনো শক্তির নয়।
  • যুক্তরাষ্ট্রই উত্তেজনার মূল কারিগর: তেহরানের স্পষ্ট অভিযোগ, মার্কিন নৌবাহিনীর অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি এবং সাম্প্রতিক সামরিক হামলাগুলোর কারণেই মূলত এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
  • চুক্তির ভিন্ন ব্যাখ্যা: সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতা চুক্তির ধারা নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ আলাদা। ওয়াশিংটনের দাবি, চুক্তিটি কেবল নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য; অন্যদিকে তেহরান মনে করে, এই চুক্তির মাধ্যমে হরমুজে ইরানের কর্তৃত্বকেই পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

​"নিয়ন্ত্রণ" বনাম "প্রভাব": সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু

​এই পুরো বিরোধের মূল জটটি লেগেছে "নিয়ন্ত্রণ (Control)" শব্দটির সংজ্ঞাকে কেন্দ্র করে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজকে একটি মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে দেখে, যেখানে সবার সমান অধিকার। অন্যদিকে, ইরান মনে করে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক সক্ষমতার কারণে এই প্রণালীতে তাদের একটি "নির্ধারক প্রভাব" রয়েছে এবং প্রয়োজনে তারা সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না।

​শেষ কথা: শান্তি আলোচনার নতুন ট্রাম্পকার্ড

​সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা আসলে কেবলই কথার লড়াই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর চাল। ইরান খুব ভালো করেই জানে, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব হারালে যেকোনো আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনা বা দরকষাকষিতে তারা তাদের প্রধান শক্তির জায়গাটি হারিয়ে ফেলবে।

​ঠিক এই কারণেই, আমেরিকা ও তার মিত্ররা আলোচনা প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার পাশাপাশি কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। জলপথের এই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

আপনার মতামত লিখুন

হরমুজ প্রণালী কার নিয়ন্ত্রণে: সেন্টকম ও ইরানের নতুন স্নায়ুযুদ্ধ।
0:00 0:00
1.0x
জনতার প্রেস

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬


হরমুজ প্রণালী কার নিয়ন্ত্রণে: সেন্টকম ও ইরানের নতুন স্নায়ুযুদ্ধ।

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৬

featured Image

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক বিবৃতিতে সরাসরি দাবি করেছে—"ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে না।" যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য মূলত তেহরানের সেই প্রচ্ছন্ন হুমকির পাল্টা জবাব, যেখানে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছিল যে প্রয়োজনে তারা এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের জাহাজ চলাচল পুরোপুরি ব্যাহত করতে পারে।

​মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ৮০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি (৩৮০ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালী দিয়ে নিরাপদে পার হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তার পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ।

​মার্কিন বিবৃতির নেপথ্য কৌশল: তিনটি মূল লক্ষ্য

​সেন্টকমের এই অনমনীয় অবস্থানের পেছনে প্রধানত তিনটি ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে:

  • বিশ্ববাজারকে আশ্বস্ত করা: হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। এখানে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলকে বার্তা দিতে চাইছে যে, সমুদ্রপথটি সম্পূর্ণ সচল ও নিরাপদ রয়েছে।
  • সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতা প্রমাণ: ৮০০ জাহাজ ও ৩৮ কোটি ব্যারেল তেল নিরাপদে পারাপারের খতিয়ান দিয়ে পেন্টাগন বিশ্বকে দেখাতে চাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে বা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি কতটা জরুরি।
  • তথ্যযুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক চাপ: এটি কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও বটে। ওয়াশিংটন বৈশ্বিক স্তরে এটি প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যে, আন্তর্জাতিক এই নৌপথের ওপর কোনো একক দেশের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে যেন বিশ্ববাসী অতিরঞ্জিত করে না দেখে।

​ইরানের পাল্টা যুক্তি: ভৌগোলিক অবস্থান ও সার্বভৌমত্বের লড়াই

​মার্কিন প্রশাসনের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। ইরানের সরকারি অবস্থান এবং সাম্প্রতিক বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের এই ন্যারেটিভের একদম বিপরীত। তেহরানের যুক্তিগুলোও বেশ জোরালো:

  • অস্বীকার করার উপায় নেই ভৌগোলিক বাস্তবতা: হরমুজ প্রণালীর উত্তর উপকূলের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ইরান। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই এই জলপথের নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের এক ধরনের বাস্তব ও আইনি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ইরানের দাবি—উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোরই, বাইরের কোনো শক্তির নয়।
  • যুক্তরাষ্ট্রই উত্তেজনার মূল কারিগর: তেহরানের স্পষ্ট অভিযোগ, মার্কিন নৌবাহিনীর অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি এবং সাম্প্রতিক সামরিক হামলাগুলোর কারণেই মূলত এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
  • চুক্তির ভিন্ন ব্যাখ্যা: সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতা চুক্তির ধারা নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ আলাদা। ওয়াশিংটনের দাবি, চুক্তিটি কেবল নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য; অন্যদিকে তেহরান মনে করে, এই চুক্তির মাধ্যমে হরমুজে ইরানের কর্তৃত্বকেই পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

​"নিয়ন্ত্রণ" বনাম "প্রভাব": সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু

​এই পুরো বিরোধের মূল জটটি লেগেছে "নিয়ন্ত্রণ (Control)" শব্দটির সংজ্ঞাকে কেন্দ্র করে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজকে একটি মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে দেখে, যেখানে সবার সমান অধিকার। অন্যদিকে, ইরান মনে করে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক সক্ষমতার কারণে এই প্রণালীতে তাদের একটি "নির্ধারক প্রভাব" রয়েছে এবং প্রয়োজনে তারা সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না।

​শেষ কথা: শান্তি আলোচনার নতুন ট্রাম্পকার্ড

​সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা আসলে কেবলই কথার লড়াই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর চাল। ইরান খুব ভালো করেই জানে, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব হারালে যেকোনো আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনা বা দরকষাকষিতে তারা তাদের প্রধান শক্তির জায়গাটি হারিয়ে ফেলবে।

​ঠিক এই কারণেই, আমেরিকা ও তার মিত্ররা আলোচনা প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার পাশাপাশি কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। জলপথের এই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।


জনতার প্রেস

সম্পাদক ও প্রকাশক
মোঃ আরেফিন ইসলাম 
নির্বাহী সম্পাদক
আবুল কালাম আজাদ
বার্তা সম্পাদক
মুক্তা আক্তার

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত জনতার প্রেস