প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬
বিয়ের কথা শুনলে অনেকেই ভয় পান, কারণ কী?
||
বয়স বাড়ছে, পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের তাগিদ আসছে, আবার বন্ধুদের অনেকেই শুরু করেছেন নতুন সংসার। তারপরও বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলেই অনেকে অস্বস্তি বোধ করেন। কেউ বিষয়টি এড়িয়ে চলেন, আবার কেউ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তারা বিয়ে করতে চান না।
সমাজে এমন মনোভাবকে অনেক সময় দায়িত্ব নিতে অনীহা কিংবা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার ভয় হিসেবে দেখা হয়। তবে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর পেছনে থাকতে পারে আরও গভীর কিছু কারণ।
বিয়ের ভয় কি মানসিক সমস্যা?
বিয়ে বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে অতিরিক্ত ও তীব্র ভয়কে গ্যামোফোবিয়া (Gamophobia) বলা হয়। এ ধরনের ভয়ের কারণে স্থায়ী সম্পর্ক কিংবা বৈবাহিক বন্ধনের কথা ভাবলেই কারও মধ্যে উদ্বেগ, অস্বস্তি বা আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। তবে বিয়ে করতে না চাওয়া কিংবা এখনই বিয়ের জন্য প্রস্তুত না থাকাকে গ্যামোফোবিয়া হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হতে পারে ভয়
বিয়ে নিয়ে আতঙ্কের পেছনে শৈশবের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া, পারিবারিক সহিংসতা, বিচ্ছেদ কিংবা অশান্তিপূর্ণ সম্পর্ক দেখলে কারও মনে বিয়ে সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। বড় হওয়ার পর সেই অভিজ্ঞতা থেকে তার মনে এমন বিশ্বাস জন্মাতে পারে যে, বিয়ে মানেই অশান্তি, মানসিক কষ্ট কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতা হারানো। ফলে সম্পর্কে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তারা দ্বিধায় ভোগেন।
অতীতের সম্পর্কের তিক্ততা
আগের সম্পর্কে প্রতারণার শিকার হওয়া, বিচ্ছেদের কষ্ট কিংবা মানসিক আঘাতও বিয়ের প্রতি অনীহা তৈরি করতে পারে। যারা সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত হওয়া বা প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয় বেশি অনুভব করেন, তাদের জন্য নতুন সম্পর্কে বিশ্বাস ও নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা কঠিন হতে পারে। একপর্যায়ে স্থায়ী সম্পর্কে জড়ানোর চিন্তাই তাদের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা
বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের ক্যারিয়ার, আর্থিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সময় ও স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, বিয়ের পর দায়িত্ব ও পারিবারিক প্রত্যাশা বেড়ে যাওয়ায় নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণে বাধা আসার আশংকা থেকেও অনেকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন কিংবা বিয়ে এড়িয়ে চলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
বিবাহবিচ্ছেদ, প্রতারণা, দাম্পত্য কলহ কিংবা বিষাক্ত সম্পর্কের অভিজ্ঞতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নানা ধরনের পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা বারবার দেখতে দেখতে কারও কারও মনে বিয়ে সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আরও দৃঢ় হতে পারে। বিশেষ করে বাস্তব জীবনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার তুলনায় নেতিবাচক ঘটনাগুলো বেশি চোখে পড়লে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বড় কারণ
বিয়ে মানেই শুধু আবেগ কিংবা ভালোবাসা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আর্থিক পরিকল্পনা, পারিবারিক দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়ও। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেকে মনে করেন, তারা এখনও বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মতো অবস্থানে পৌঁছাননি। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে বিয়েকে ঘিরে পারিবারিক ও সামাজিক প্রত্যাশা বেশি থাকায় এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় এই ভয়?
বিয়ে নিয়ে ভয় থাকলেই যে কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ, এমন ধারণা সঠিক নয়। কেউ ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে বিয়ে করতে না-ও চাইতে পারেন, আবার কেউ জীবনের নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দুটিই স্বাভাবিক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
তবে বিয়ে নিয়ে ভয় যদি অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি করে, দৈনন্দিন জীবন বা সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। নিজের ভয় ও অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, অনুভূতির কারণ বোঝার চেষ্টা এবং প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উপকারী হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, বিয়ে নিয়ে প্রত্যেক মানুষের অনুভূতি ও সিদ্ধান্ত আলাদা। কাউকে সামাজিক চাপের কারণে বিয়েতে বাধ্য না করে তার পছন্দ, মানসিক প্রস্তুতি ও ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত জনতার প্রেস