প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬
ইরানের কাছে ২৫০ দিনের বেশি মার্কিন রণতরী, নাবিকদের দুর্ভোগ নিয়ে উদ্বেগ
শাহীন ||
ইরানের কাছে দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এ অবস্থানরত হাজারো মার্কিন সামরিক সদস্যের জীবনযাপন নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট, পানি ও প্লাম্বিং সমস্যা, দীর্ঘদিন লন্ড্রি সুবিধা বন্ধ থাকা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তির অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারাও পেন্টাগনের কাছে জবাব চেয়েছেন।মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য নিয়ে চলা রণতরীটি ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করছে। দীর্ঘ এই মোতায়েনের কারণে নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্টাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাঠানো এক চিঠিতে রণতরীটির বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তার অভিযোগ, মৌলিক সরবরাহের সংকট, পানি দূষণ, প্লাম্বিংয়ের সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেক নিরাপত্তা এবং ডাক ব্যবস্থায় বিঘ্নের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।ব্লুমেন্টাল প্রশ্ন তুলেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী বর্তমানে বিমানবাহী রণতরীগুলোর ওপর যে ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অপারেশনাল চাপ প্রয়োগ করছে, তা আদৌ টেকসই কি না।ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগোও পরিস্থিতি তদন্তে কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদলকে রণতরীটিতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, রণতরীর পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতাদের প্রবেশাধিকার না দেওয়ার কোনো কারণ নেই।নাবিকের সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় তদন্তসিবিএস নিউজের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে একজন নাবিক সমুদ্রের পানিতে পড়ে যান। পরে একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করা হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রণতরী থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।এর আগে মিলিটারি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের প্রতিবেদনে কয়েকজন নাবিকের পরিবারের সদস্যদের উদ্বৃতি দিয়ে দাবি করা হয়, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান এবং জাহাজের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে কিছু সদস্য চরম মানসিক চাপে রয়েছেন।পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে লন্ড্রি সুবিধা না পাওয়া, বন্দরে কম যাতায়াত এবং তাজা খাবারের সীমিত সুযোগ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একজন নাবিকের আত্মীয় দাবি করেছেন, দীর্ঘ মোতায়েনের সময় ওই নাবিকের প্রায় ২৯ কেজি ওজন কমেছে।জাহাজের জীবনযাপন নিয়ে একাধিক অভিযোগক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইকেল লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রণতরীটির বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ছত্রাকযুক্ত শাওয়ার, নষ্ট টয়লেট, সপ্তাহের পর সপ্তাহ লন্ড্রি বন্ধ থাকা, দীর্ঘ সময় গরম পানির সংকট এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসামগ্রীর ঘাটতি।এমনকি খাবারের পরিমাণ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো সময় এক বেলায় খুব সীমিত পরিমাণ খাবার পাওয়ার দাবিও করা হয়েছে।পরিবারের সদস্যদের মতে, রণতরীতে বিমান ওঠানামা ও ইঞ্জিনের কারণে সৃষ্টি হওয়া অবিরাম শব্দ ও কম্পনও নাবিকদের বিশ্রাম ও মানসিক স্বস্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।নৌবাহিনীর দাবিতবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। একজন নৌ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রণতরীতে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন কার্যক্রমের কারণে প্রচলিত সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। বর্তমানে খাবার, স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী এবং এরপর ডাক বা মেইল পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।নৌবাহিনীর ওই কর্মকর্তার দাবি, রণতরী থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশুদ্ধ পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পুষ্টিকর খাবারের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।অভিযোগকে ‘ভুলভাবে উপস্থাপন’ বললেন হেগসেথরণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে ‘ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, মার্কিন সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে প্রতিটি জাহাজ, ক্রু ও ক্যাপ্টেন প্রয়োজনীয় সহায়তা ও রসদ পায়।হেগসেথ দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনে থাকা নাবিকদের প্রশংসা করে বলেন, কঠিন পরিস্থিতিতে তারা যে দায়িত্ব পালন করছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ মার্কিন সামরিক বাহিনীকে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় রসদ ও সক্ষমতা দিয়ে প্রস্তুত রাখার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।রণতরী বদলের প্রস্তুতিগত নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে যাত্রা শুরু করা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন প্রথমে দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। পরে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী মে মাসে রণতরীটির দেশে ফেরার কথা থাকলেও এর মোতায়েন কয়েক দফা বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে ফেরার নির্দিষ্ট কোনো তারিখও ঘোষণা করা হয়নি।তবে একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে পুরোনো উদ্বেগমার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে দীর্ঘ সময় অবস্থানের মানসিক চাপ নিয়ে আগেও বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত একটি সমীক্ষায় নৌবাহিনীর জাহাজে কর্মরত সদস্যদের মধ্যে তীব্র মানসিক সংকটের বিষয়টি উঠে আসে।সমীক্ষায় বসবাসের অনুপযুক্ত পরিবেশ, অতিরিক্ত শব্দ এবং পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবকে নাবিকদের মানসিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।বর্তমানে আব্রাহাম লিংকনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ তাই শুধু একটি রণতরীর অভ্যন্তরীণ সমস্যার বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েন, নাবিকদের কল্যাণ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।সূত্র: বিবিসি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত জনতার প্রেস