প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
আইনের আয়নায় পঞ্চদশ সংশোধনী: আজ মিলবে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়।
আবুল কালাম আজাদ , নির্বাহী সম্পাদক ||
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ আজ। ২০১১ সালে সংবিধানে আনা বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর আইনি বৈধতার চূড়ান্ত ভাগ্য আজ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে। টানা তিন দিনের নিবিড় ও চুলচেরা আইনি শুনানি শেষে, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বিভাগ বেঞ্চ আজ বৃহস্পতিবার এই বহুপ্রত্যাশিত রায় ঘোষণা করবেন।চব্বিশের রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে, তার আলোকেই যেন নতুন করে পর্যালোচিত হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আইন—সংবিধান।বিচারালয়ের এজলাসে তিন দিনের তুমুল বিতর্কগত বুধবার সুদীর্ঘ ও গভীর আইনি যুক্তি-তর্কের পর আপিল বিভাগ রায়ের এই দিন ধার্য করেন। আদালত কক্ষের সেই আবহ ছিল টানটান উত্তেজনায় ঠাসা, যেখানে একদিকে ছিল রাষ্ট্রের আইনি অভিভাবকবৃন্দ, অন্যদিকে ছিলেন নাগরিক অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো যেভাবে বদলে দেওয়া হয়েছিল, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই তিন দিনে।হাইকোর্টের সেই ঐতিহাসিক রায় ও পটভূমি২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশবিশেষকে অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপসহ সংবিধানের মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছিল।হাইকোর্ট তার রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে—
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সম্পূর্ণভাবে সংবিধানের পরিপন্থী। এর পাশাপাশি সংবিধানে জোরপূর্বক যুক্ত করা ৭ক, ৭খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদকেও বাতিল ঘোষণা করা হয়। একই সাথে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা গণভোটের বিধান-সংক্রান্ত ১৪২ অনুচ্ছেদটি পুনর্বহাল করার আদেশ দেন হাইকোর্ট।
তবে পুরো আইনটি সম্পূর্ণ বাতিল না করে, অন্য ধারাগুলোর বিষয়ে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের ওপর সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের এই আংশিক বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়েই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।আইনের লড়াইয়ে মুখোমুখি যারাএই আইনি লড়াইয়ের নেপথ্যে রয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি, নওগাঁর বাসিন্দা মো: মোফাজ্জল হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।আদালতের এই মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে আইনের ব্যাখ্যা ও যুক্তি তুলে ধরেন দেশবরেণ্য আইনজীবীরা:
নাগরিক সমাজের পক্ষে: সিনিয়র আইনজীবী শরীফ ভূইঁয়া ও কারিশমা জাহান।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে: সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
অন্যান্য আপিলকারীর পক্ষে: আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির।
রাষ্ট্রপক্ষে: সুপ্রিম কোর্টের প্রধান আইন কর্মকর্তা তথা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।
রায়ের অপেক্ষায় দেশ
আজকের এই রায় শুধু একটি সংশোধনীর ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং তা দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের এক নতুন রূপরেখা তৈরি করবে। রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে চায়ের কাপ—সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন: সুপ্রিম কোর্টের এই চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে কি তবে দেশের সংবিধানে ফিরতে চলেছে সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা? উত্তর মিলবে আজ।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত জনতার প্রেস