প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
৩০০ গরিবের ভাগ্য বদলাতে ৮ কোটি, পরামর্শক ও প্রশাসনিক খরচ ৫৩ কোটি: সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিতর্কিত প্রকল্প প্রস্তাব।
আবুল কালাম আজাদ ||
৩০০ গরিবের ভাগ্য বদলাতে ৮ কোটি, পরামর্শক ও প্রশাসনিক খরচ ৫৩ কোটি: সমাজসেবা অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘরবাড়ি হারানো অসহায় মানুষের পুনর্বাসন ও সহায়তার নামে সরকারি অর্থ অপচয়ের এক অভিনব চিত্র সামনে এসেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পে মাত্র ৩০০ জন মানুষের ভাগ্য বদলানোর জন্য অনুদান ধরা হয়েছে ৮ কোটি টাকা। অথচ, এই অনুদান বিতরণের জন্য পরামর্শক ও প্রশাসনিক বিলাসিতার পেছনে খরচ ধরা হয়েছে ৫৩ কোটি টাকারও বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তুহারা ও দরিদ্র মানুষের সহায়তার দোহাই দিয়ে প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই সুকৌশলে আমলা ও পরামর্শকদের পকেটে ভরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।## প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
প্রকল্পের নাম: ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’।
উদ্যোক্তা সংস্থা: সমাজসেবা অধিদপ্তর।
অর্থায়নকারী সংস্থা: জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জিআইজেড)।
মোট বাজেট: ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
বাস্তবায়নকাল: ১ বছর ৯ মাস।
লক্ষ্য: খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের মতো শহরে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা (৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ১৫০০ জনের জীবিকা উন্নয়ন)।
## বাজেটের চালচিত্র: গরিবের ভাগে মাত্র ১৩.২৩%
প্রকল্পের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মূল লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পেছনেই বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যাবে। পরোক্ষ খরচই এখানে মূল খরচের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
ব্যয়ের খাত
বরাদ্দের পরিমাণ (টাকা)
মোট বাজেটের শতাংশ
প্রকৃত অভাবী মানুষের অনুদান
৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার
১৩.২৩%
পরামর্শক ও প্রশাসনিক বিলাসিতা
৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার
৮৬.৭৭%
মোট বাজেট
৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার
১০০%
## প্রধান অসঙ্গতি ও আপত্তির জায়গাসমূহ
১. ৩০০ মানুষের জন্য ৪৭৩ জন পরামর্শক!
তিন জেলার মাত্র ৩০০ জন দরিদ্র মানুষের (২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী) ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরির জন্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক। এই পরামর্শকদের পেছনেই ব্যয় হবে ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা মোট বাজেটের ৪৮.৩৩ শতাংশ।
২. নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে বিদেশ ভ্রমণের আবদার
সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রসাধন এবং বৈদেশিক ভ্রমণে কঠোর নিষেধাড়জ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের নামে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য রাখা হয়েছে আরও ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
৩. অন্যান্য মাত্রাতিরিক্ত খরচ
ব্যবস্থাপনা চার্জ: ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
অফিস ভবন ভাড়া: ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
আইটি ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম: পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এই খাতে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য ধরা হয়েছে।
৪. বিধি লঙ্ঘন ও অস্পষ্টতা
উপকারভোগী (বাস্তুচ্যুত ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি) বাছাইয়ের কোনো স্বচ্ছ রূপরেখা বা পদ্ধতি দেওয়া হয়নি।
প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
প্রকল্পের মেয়াদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে পার হয়ে যাওয়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।
## পরিকল্পনা কমিশন ও বিশ্লেষকদের অবস্থান
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এই ব্যয় কাঠামো নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উচ্চ পরামর্শক ব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক খরচ যাচাই-বাছাই করে তা কমানোর নির্দেশ দেওয়া হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন:
"প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সুবিধাভোগীদের ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া। অথচ অন্যান্য খাতে বাজেটের সিংহভাগ খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। পিইসি সভায় এই প্রকল্পের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে এবং যেসব খাতে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে সেগুলো কমাতে বলা হবে।"
বিশ্লেষকদের মতে, এসডিজি (SDG) অর্জনের দোহাই দিয়ে নেওয়া এই প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো সংশোধন না করলে এটি কেবল সরকারি অর্থের অপচয় হিসেবেই গণ্য হবে এবং প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না।
## সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাফাই: দায় দাতা সংস্থার ওপর
ব্যয়ের এই অস্বাভাবিকতার বিষয়ে দায় নিতে নারাজ সমাজসেবা অধিদপ্তর। তাদের দাবি, এটি একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প যা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে এসেছে এবং দাতা সংস্থা জিআইজেড (GIZ) নিজেই এই প্রস্তাবনা তৈরি করেছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম জানান:
যেহেতু এটি অনুদানের টাকা, তাই দাতা সংস্থার শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম থাকে।
বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি কেবল প্রস্তাবে আছে, সরকার অনুমতি দিলেই কেবল ভ্রমণ হবে, অন্যথায় টাকা পড়ে থাকবে।
কাজের প্রয়োজনেই অফিস ভাড়ার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত জনতার প্রেস